শিখরে মোদি:
অনেকে বলেন, তাঁর উত্থান ইতিহাস। উত্থানের পরও ইতিহাস গড়েছেন। ২০১৪ থেকে ২০২৬। এক যুগ। এই ১২ বছরে, চলার পথে একের পর এক মাইলস্টোন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবার তিনি শীর্ষে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে টপকে। স্বাধীন ভারতে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবথেকে বেশি দিন চেয়ারে।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জওহরলাল নেহরু। কিন্তু, তখন তিনি ছিলেন মনোনীত। নির্বাচিত নন।
ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৫২ সালে।
ভোটে জিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু।
প্রধানমন্ত্রী পদে তিনি শপথ নেন ১৯৫২ সালের ১৩ মে।
১৯৬৪ সালের ২৭ মে পর্যন্ত টানা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেহরু।
১৩ মে, ১৯৫২ থেকে ২৭ মে, ১৯৬৪। অর্থাৎ ৪ হাজার ৩৯৮ দিন।
শিখরে নরেন্দ্র মোদি (৪,৩৯৯ দিন):
জওহরলাল নেহরু এবং নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ইতিহাসে দু’টি অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দু’জনের ইনিংসের দৈর্ঘ্য নিয়ে তুলনা করা যেতেই পারে। কিন্তু, এই দুই ইনিংসের সময়কালের তুলনা করাটা বোধহয় একটু কঠিন। কারণ, নেহরু যে ভারতের শাসনভার হাতে পেয়েছিলেন, সেই ভারত তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে।
জনসংখ্যা মেরেকেটে ৩৪ কোটি। সবার চোখে একটাই স্বপ্ন। স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে থাকা। তখন নেহরুর লক্ষ্য মূলত ছিল দেশ গঠন করা। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা কেমন হবে, অর্থনীতির কাঠামো কী হবে, প্রশাসনের চেহারা কেমন হবে। আর ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন ভারতের জনসংখ্যা ১৩০ কোটির বেশি। এই ভারত স্বপ্ন দেখে গোটা পৃথিবীকে টেক্কা দেওয়ার সবথেকে দ্রুত গতিতে বেড়ে চলা অর্থনীতি হওয়ার ৷ অর্থাৎ কৃষি থেকে শিল্প, সবকিছুতেই স্বনির্ভর হওয়ার।
প্রত্যাশা বেশি। তাই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও কঠিন। শুধু তাই নয়। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক পথও মোটের উপর মসৃণই ছিল। নেহরু যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন দেশজুড়ে স্বাধীনতার আবেগ। কংগ্রেস ছাড়া অন্য কোনও দলের কথা দেশবাসী ভাবতোই না ৷ প্রতিপক্ষ বলতে, জনসংঘ, সিপিআই এবং আরও কিছু ছোটখাটো দল।এদের কেউই কংগ্রেসকে চ্যালেঞ্জ করার মতো পরিস্থিতিতে ছিল না। ফলে, ভোটে জেতার জন্য সেভাবে মাথা ঘামাতে হয়নি নেহরুকে। রাজনীতি তাঁর প্রশাসনিক গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসছেন, তখন রাজনীতিই দেশের চালিকা শক্তি। প্রধান বিরোধী কংগ্রেস। রাজ্যে রাজ্যে শক্তিশালী আঞ্চলিক দল।
প্রধানমন্ত্রী পদে উত্তরাধিকার হিসেবে নরেন্দ্র মোদি স্বাধীনতার আবেগ পাননি, তিনি পেয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, নীতিপঙ্গুত্ব এবং রাজনীতির লাল ফাঁস। প্রতিপদে এই বাধা অতিক্রম করে এগোতে হয়েছে তাঁকে। সেই সঙ্গে বিরোধী শিবিরের এককাট্টা প্রতিরোধ।
নেহরুর আমলকে বলা হতো ‘কংগ্রেস সিস্টেম।’ অর্থাৎ কংগ্রেস ছাড়া দল নেই। ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনে লোকসভার ৪৮৯টি আসনের মধ্যে ৩৬৪-টিই কংগ্রেস জিতেছিল। পরের কয়েক দশক, কেন্দ্র-রাজ্য সব জায়গাতেই কংগ্রেসের সরকার। ফলে কেন্দ্রের নীতি রাজ্যে রাজ্যে কার্যকর করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন কিছু রাজ্য কংগ্রেসের হাতে। কোথাও ক্ষমতায় তৃণমূল, কোথাও ডিএমকে, কোথাও সমাজবাদী পার্টি, কোথাও বামেরা।
জওহরলাল নেহরুর জমানায় সংবাদমাধ্যম বলতে শুধুমাত্র খবরের কাগজ। সরকারের কাজের ভালমন্দ নিয়ে লেখার জন্য থাকতো কিছু সাংবাদিকের কলম। এখন দেশ-বিদেশের মিডিয়া, শয়ে শয়ে নিউজ চ্যানেল। এমনকী, সরকারের কাজকর্ম নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় মুখ খুলতে পারেন আম আদমিও। প্রতিমুহূর্তেই যেন প্রশাসনের কাজের উপর নজর রাখা হচ্ছে। এদিক থেকে ওদিক হলেই ভাইরাল। দেশে খবর। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও ব্রেকিং নিউজ। এই চাপ সামলাতে হয়নি নেহরুকে। এই চ্যালেঞ্জকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে চলেছেন মোদি…‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।’