কৃষি না শিল্প। এই বিতর্ক চিরকালীন। কিন্তু, ভারতের মতো দেশে কৃষি এবং শিল্প, দু’টোই নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি…শিল্প…কৃষি ভিত্তিক শিল্প…নিখুঁত ভারসাম্যেই লুকিয়ে থাকে অর্থনীতির এগিয়ে চলার আসল অঙ্ক। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবথেকে বেশি দিন ক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদি। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে টেক্কা দিয়ে। অর্থনীতির দাঁড়িপাল্লাতেও কি নেহরু জমানাকে পিছনে ফেলে দিতে পেরেছে মোদির আমল? আসুন…একটু সেই হিসেব কষে দেখি।
১৯৪৭। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ, তখন হামাগুড়িও দিতে শেখেনি। অর্থ নেই। নীতিও নেই। নেহরুর টার্গেট তখন, অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করা, রাষ্ট্রনির্ভর শিল্পের পথে হাঁটা, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা, দেশকে সমৃদ্ধশালী করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, ভারতের দারিদ্র্য, শিক্ষার হার, দেশভাগের ধাক্কা, খাদ্য সংকট, পুঁজি এবং প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা।
যাবতীয় সমস্যাকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে শুরু করেছিল দেশের অর্থনীতি। ঘটনা হল, নেহরু এমন একটি অর্থনীতিকে হাতে পেয়েছিলেন, যেটি সদ্যোজাত। কাঁচা মাটির তাল। ফলে, নিজের মনের মতো করে সেটিকে গড়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর কাছে। তিনি সেটা করেওছিলেন। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে সেই সুযোগ ছিল না। ২০১৪ সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশের অর্থনীতির চাহিদা আলাদা। চ্যালেঞ্জও আলাদা। ভারতের অর্থনীতি ততদিনে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী অর্থনীতিগুলির মধ্যে একটি। উদারীকরণের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে ভারতীয় অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শ্রম-নির্ভর শিল্পের বেশিরভাগই প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির টার্গেট, ভারতের অর্থনীতিকে বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতিতে পরিণত করা।
ভারতকে বিশ্বের সবথেকে দ্রত গতিতে এগিয়ে চলা অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আন্তর্জাতিক চাহিদাকে মাথায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো। ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত শক্ত করা। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে নেহরু মন বেশি দিয়েছিলেন ভারী শিল্পে। যেমন ইস্পাত কারখানা। বিদ্যুৎ তৈরির কেন্দ্র ইত্যাদি। তখন মনে করা হত, ভারী শিল্প না হলে চাকরি হবে না। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে অর্থনীতির দাবি বদলেছে। কম্পিউটার এসেছে। শিল্পক্ষেত্রের ছবি বদলে দিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। এখন তো আসরে এআই।
আজকের যুগে সবথেকে বেশি কর্মসংস্থান হয় সার্ভিস সেক্টর এবং ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে। অর্থাৎ এমএসএমই-তে। ২০২৩-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩২ শতাংশই আসে সার্ভিস সেক্টর থেকে। ২৫ শতাংশ সরাসরি শিল্প থেকে। আজকের যুগে কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় উৎস সমবায় শিল্প। যা বড় কর্পোরেটের মতো সরাসরি চাকরি দেয় না। কিন্তু, গ্রামীণ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রচুর কাজের সুযোগ তৈরি করে। যেমন আমুলের মতো সমবায় সংস্থা। দেশে এখন ৮ লক্ষের বেশি সমবায় সংস্থা রয়েছে।
আসলে প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, শিল্পের ক্ষেত্রে কর্মীর সংস্থা ততই কমেছে। আগে একটা গাড়ির কারখানায় প্রতিটা ক্ষেত্রে, প্রতিটা ধাপে প্রশিক্ষিত কর্মীদের রাখতে হত। এখন গোটাটাই হয় অটোমেশনে। মেশিনে। শুধু গোটা প্রক্রিয়াটা সুপারভাইস করার জন্য লোক লাগে। তাই, নতুন ভারতে কর্মসংস্থান তৈরি করতে টার্গেট বদলাতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও। তিনি জোর দিয়েছেন ডিজিটাল ইকোনমিতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে, সার্ভিস সেক্টরে, তথ্যপ্রযুক্তিতে, ই-কমার্সে, পরিকাঠামো নির্মাণে।
ভারতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নেহরুর চ্যালেঞ্জ ছিল মূলত ঘরোয়া। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদির চ্যালেঞ্জ বহুমুখী। ঘরে-বাইরে। বিশ্ব দুনিয়ায় সমীকরণের লড়াই। একদিকে, চিন-রাশিয়া। অন্যদিকে, আমেরিকা-ইউরোপ। ভারত কারও পক্ষে নয়। কারও বিপক্ষেও নয়। কিন্তু, এই অবস্থায় বাণিজ্যে বজায় রাখতে গিয়ে কালঘাম ছুটে যাওয়ার জোগাড়। রাশিয়ার থেকে তেল কিনলে খরচ কম পড়বে, কিন্তু আমেরিকার গোঁসা হবে। আবার ইউনাইটেড আরব আমিরশাহীর সঙ্গে ব্যবসা করতে গেলে সৌদি আরব চটে যাবে। বাইরের দুনিয়ায় ব্যালেন্স বজায় রেখে, ঘরের অর্থনীতি সামাল দেওয়াই নরেন্দ্র মোদির প্রধান চ্যালেঞ্জ। তার উপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাষ্ট্রনেতা তো আছেনই। তিনি কখন, কীসে কর বসাবেন সেটা আমেরিকাও জানে না।
এই পরিস্থিতিতে বাইরের ঝড় ঝাপটা থেকে দেশকে বাঁচাতে চান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি চান, যে সমস্ত জিনিস কিনতে আমাদের বেশি বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়, সেই সব জিনিসে ভারতকে স্বনির্ভর করে তুলতে তেল বা গ্যাসে স্বনির্ভর হওয়া এখনই কঠিন। তাই নজরে কৃষি। নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারলে নিশ্চিতভাবেই অনেক ডলার বাঁচে। করোনা থেকে যুদ্ধ…চ্যালেঞ্জের পাহাড়। যাবতীয় সেই চ্যালেঞ্জ টপকেই মোদির অর্থনীতি।
আজ পৃথিবীর সবথেকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা অর্থনীতি। ফাস্টেস্ট গ্রোইং ইকোনমি। ২০১৪ সালে মোদি যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশের অর্থনীতি ছিল ২ লক্ষ কোটি ডলারের, ২০২৬-এ দ্বিগুণ হয়ে তা পৌঁছে গিয়েছে ৪ লক্ষ কোটি ডলারে। নেহরুর আমলে দেশের অর্থনীতির বহর ছিল ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার। মোদির আমলে সেটাই ৪ লক্ষ কোটি ডলার।