‘কেনেডি নিউজ অ্যান্ড মিডিয়া’-কে উদ্ধৃত করে এমনই তথ্য প্রকাশ করেছে ‘পিপল’ পত্রিকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সফল আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর নিজের পেশা বদলে পূর্ণকালীন ‘ডগ ওয়াকার’ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন লিজ। বর্তমানে প্রতি মাসে হাজার হাজার পাউন্ড আয় করছেন তিনি।
কিন্তু কেন এমন বড় সিদ্ধান্ত? এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা।
লিজ জানিয়েছেন, প্যারা-লিগাল হিসেবে কাজ করার সময় তাঁকে সবসময়ই প্রবল চাপের মধ্যে থাকতে হত। ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের আইনজীবী হিসেবে কাজ করা ছিল অত্যন্ত চাপের। প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে আদালতে যাওয়া, কারাগারে যাওয়া এবং মক্কেলদের সঙ্গে যোগাযোগ—সব দায়িত্বই সামলাতে হত তাঁকে।
চার বছর এই পেশায় থাকার পর লিজ বুঝতে পারেন, যে পেশাকে একসময় নিজের স্বপ্ন মনে করেছিলেন, সেটিই তাঁর মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। কাজের অতিরিক্ত চাপ তাঁকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। লিজের কথায়, ‘‘আমার প্রকৃত বয়সের তুলনায় নিজেকে অনেক বেশি বয়স্ক মনে হত। প্রতিদিন ভাবতাম, এটাই কি তবে আমার জীবন?’’
লন্ডনের জীবনযাত্রা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন লিজ। তিনি বলেন, ‘‘লন্ডনের জীবনযাত্রার একটা বিষয় হল, সবাই আশা করে আপনি বাইরে গিয়ে মদ্যপান করবেন বা আড্ডায় যোগ দেবেন। ফলে অনেক সময় রাত ৯টা বা ১০টার আগে বাড়ি ফেরা হত না। আমার মনে হয় না পরিবার গঠনের জন্য এই জীবনধারা দীর্ঘমেয়াদে উপযুক্ত।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এটা কোনও জীবন নয়। এতে প্রচুর মানসিক চাপ থাকে এবং মানুষ তা উপভোগ করেন না। কিন্তু ভালো আয়ের কারণে মানুষ এই পেশায় থেকে যান। অর্থই মানুষকে এর মধ্যে আটকে রাখে।’’ এই পরিস্থিতিতেই আইন পেশায় নিজের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন লিজ। মানসিক ভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকেই শেষ পর্যন্ত পেশা বদলের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
লিজের স্বামীও কুকুর হাঁটানো এবং ‘ডগ-বোর্ডিং’-এর কাজ করেন। নিজের স্বামীর কাজের প্রতি ভালোবাসা দেখেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেন লিজ। তাঁর কথায়, ‘‘আমার স্বামী কুকুর নিয়ে হাঁটানো এবং তাদের দেখাশোনা বা ‘ডগ-বোর্ডিং’-এর কাজ করেন এবং তিনি তাঁর কাজকে ভালোবাসেন। তাই এমন একজন মানুষের সান্নিধ্যে থেকে আমি ভাবলাম, কেন আমি প্রতি সপ্তাহান্তে কাজ নিয়ে আতঙ্কিত বোধ করছি এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছি?’’
এর পরেই নিজের ‘পেট কেয়ার’ ব্যবসার জন্য গ্রাহক খোঁজার পাশাপাশি খরচ চালাতে স্থানীয় একটি পানশালায় কাজ শুরু করেন লিজ। মাত্র এক বছরের মধ্যেই নিয়মিত গ্রাহক পেয়ে যান তিনি। বর্তমানে লিজ প্রতিদিন চারটি ‘গ্রুপ ওয়াক’ পরিচালনা করেন। অর্থাৎ, দলবদ্ধ ভাবে কুকুরদের নিয়ে হাঁটতে বের হন তিনি। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০টি কুকুরের দেখাশোনা করেন লিজ।
প্রতি কুকুরের জন্য ঘণ্টায় প্রায় ১৪ পাউন্ড, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১,৮০০ টাকা পারিশ্রমিক নেন তিনি। সেই হিসাবে দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ পাউন্ড পর্যন্ত আয় করেন লিজ। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৮,৫০০ থেকে ৫১,৪০০ টাকা। পেশা বদলের পর অবশ্য সমালোচনাও শুনতে হয়েছে তাঁকে। লিজ জানান, অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেছেন, ‘‘আইন পেশা ছেড়ে কুকুর নিয়ে হাঁটার কাজে এলেন? এত পড়াশোনা করার পর এখন শুধু কুকুর নিয়ে হাঁটছেন?’’ কেউ কেউ এমনও মনে করতেন যে, তাঁর জীবনের ছয় বছর নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
তবে লিজের মতে, সেই ছয় বছরে অর্জন করা অভিজ্ঞতা এখনও তাঁর কাজে লাগে। তিনি বলেন, ওই সময়ে অনেক কিছু শিখেছেন, যা বর্তমানে তাঁর দৈনন্দিন জীবনেও কাজে আসে। লিজ আরও জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে কুকুর হাঁটানোর কাজ করলে আয় খুব বেশি হয় না। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। বর্তমানে আগের কর্পোরেট চাকরির তুলনায় মাসে কয়েক হাজার পাউন্ড বেশি আয় করছেন তিনি। অথচ আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক সময় কাজ করেই এই আয় করছেন।
লিজের এই পেশা বদলের কাহিনি ইতিমধ্যেই ব্রিটেনজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নেটপাড়াতেও তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। তরুণীর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন নেটাগরিকদের একাংশ।