হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে চালানো সামরিক অভিযানের পিছনের ‘সাইকোলজি’-ও তিনি ব্যাখ্যা করেন। আর এই পুরো কাহিনির কেন্দ্রে ছিলেন তাঁর বড় ভাই, ইয়োনাতান ‘ইয়োনি’ নেতানিয়াহু এবং তাঁর বলা সেই শেষ ৫টি কথা, যা নেতানিয়াহু আজও নিজের হৃদয়ে ধারণ করে চলেছেন: ‘We have no other choice’ (আমাদের কাছে অন্য কোনও বিকল্প নেই)।
ইজরায়েলে ১৯৬৭ সালের সেই ভয়াবহ সময়:
ভাষণের সময় নেতানিয়াহু অতীতের পাতা উল্টে ১৯৬৭ সালের ‘সিক্স-ডে ওয়ার’-এর ঠিক আগের দিনগুলিতে ফিরে যান। নেতানিয়াহু জানান, সেই সময় তিনি আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় পড়াশোনা করছিলেন। ইজরায়েলে হামলা চালানোর জন্য তিনটি আরব দেশের—মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডন—সেনাবাহিনী প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইজরায়েল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এতটাই প্রবল ছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের নাগরিকদের কবর দেওয়ার জন্য গণকবর খোঁড়া হচ্ছিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে ১৭ বছরের তরুণ বিবি (বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু) ইজরায়েলে পৌঁছন। গোটা দেশ ব্ল্যাকআউটের অন্ধকারে ডুবে ছিল। চারদিকে আতঙ্ক এবং নিস্তব্ধতা। এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু তাঁর ২১ বছর বয়সি বড় ভাই ইয়োনির সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছিলেন। ইয়োনি ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর প্যারাট্রুপার ইউনিটের একজন অফিসার ছিলেন।
রামলার বাগানে কফি এবং নেতানিয়াহুর ভাইয়ের সেই ৫ ঐতিহাসিক শব্দ:
রামলার আশপাশের কমলালেবুর বাগানগুলিতে সেনাদের তাঁবু খাটানো ছিল। ঘুরতে ঘুরতে নেতানিয়াহু তাঁর ভাইয়ের কাছে পৌঁছন। দুই ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। সেনাদের কেটলিতে তৈরি কফিতে চুমুক দিতে দিতে ছোট ভাই নেতানিয়াহু বড় ভাইকে সেই প্রশ্নই করেন, যা সেই সময় গোটা ইজরায়েলের প্রশ্ন ছিল, ‘ইয়োনি, এবার আমাদের কী হবে? এরপর কী হতে চলেছে?’
ইয়োনি এক মুহূর্তের জন্য থামলেন, ছোট ভাইয়ের চোখের দিকে তাকালেন এবং তারপর এমন কথা বললেন, যা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর গোটা জীবন ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিয়েছিল। ইয়োনি বলেছিলেন, ‘‘আমরা জিতব বিবি, কারণ জেতা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোনও বিকল্পই নেই!’’
নেতানিয়াহুর মতে, এটি শুধুমাত্র ৫টি শব্দ ছিল না; এটি ইজরায়েলের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। ইজরায়েল যদি যুদ্ধে হেরে যায়, তাহলে ইজরায়েলের নাম-নিশানা মুছে যাবে। তাই ইজরায়েলের কাছে জয় কোনও ‘পছন্দ’ বা ‘বিকল্প’ নয়, বরং ‘অস্তিত্বের বাধ্যবাধকতা’।
এনটেব্বে-র সেই সাহসী ‘ইয়োনি’: ১০৩ জনের প্রাণ বাঁচিয়ে নিজে প্রাণ দিয়েছিলেন:
নেতানিয়াহু বিশ্বকে মনে করিয়ে দেন যে তাঁর ভাই ইয়োনি শুধু কথার কথা বলতেন না। ১৯৭৬ সালে প্যালেস্তিনীয় সন্ত্রাসবাদীরা যখন এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান ছিনতাই করে উগান্ডার এনটেব্বে-তে নিয়ে গিয়েছিল, তখন ইয়োনি নেতানিয়াহুই সেই গোপন কমান্ডো অভিযানের প্রধান ছিলেন।
সন্ত্রাসবাদীরা ইহুদিদের আলাদা করে বেছে নিয়ে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল, একেবারে নাৎসিদের কায়দায়। ইজরায়েল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আফ্রিকার কেন্দ্রে গিয়ে ইজরায়েলি কমান্ডোরা ১০৩ জন ইহুদি পণবন্দিকে মৃত্যুর মুখ থেকে নিরাপদে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক অভিযানের সাফল্যের মূল্য নেতানিয়াহু পরিবারকে নিজেদের ছেলেকে হারিয়ে দিতে হয়েছিল। ইয়োনি নেতানিয়াহুই ছিলেন ওই পুরো অভিযানে নিহত একমাত্র ইজরায়েলি সেনা।
৭ অক্টোবর ২০২৩: ইতিহাসের সেই কালো পাতা এবং হামাসের নির্মূল:
এনটেব্বের সেই আত্মত্যাগের ৪৭ বছর পর, ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে ইজরায়েল নিজের মাটিতে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলার সাক্ষী হয়। হামাসের সন্ত্রাসবাদীরা ইজরায়েলে ঢুকে ১,২০০-রও বেশি মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং শত শত সাধারণ নাগরিককে পণবন্দি করে নিয়ে যায়।
নেতানিয়াহু রাষ্ট্রসংঘে স্পষ্ট করে দেন যে হামাসের এই হামলা ১৯৬৭ এবং ১৯৭৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আজ যখন গোটা বিশ্ব ইজরায়েলের উপর যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিচ্ছে, তখন তাঁর ভাই ইয়োনির সেই কথাগুলিই তাঁর মনে পড়ে। নেতানিয়াহুর বিশ্বাস, হামাসকে অর্ধেক অবস্থায় রেখে ইজরায়েল নিরাপদ থাকতে পারে না। হামাস বেঁচে থাকলে তারা আবার ৭ অক্টোবরের ঘটনা ঘটাবে। তাই হামাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা ইজরায়েলের জন্য কোনও রাজনৈতিক জেদ নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার একমাত্র বাধ্যবাধকতা।
কেন কারও সামনে মাথা নত করছেন না নেতানিয়াহু?
নো-কম্প্রোমাইজ পলিসি: নেতানিয়াহুর এই বার্তা আমেরিকা, ইউরোপীয় দেশগুলি এবং রাষ্ট্রসংঘের কাছে স্পষ্ট—ইজরায়েল কোনও চাপের মুখে গাজায় অভিযান বন্ধ করবে না।
হামাস ও হিজবুল্লাহকে সরাসরি বার্তা: ইজরায়েল তার শত্রুদের বোঝাতে চায় যে তারা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়বে, কারণ পিছিয়ে আসার কোনও পথ তাদের কাছে নেই।
দেশীয় রাজনীতিতে প্রভাব: ইজরায়েলের অভ্যন্তরে পণবন্দিদের মুক্ত করা এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য নেতানিয়াহুর উপর প্রবল চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ভাইয়ের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি দেশের মানুষকে বোঝাতে চাইছেন যে ইজরায়েলের নিরাপত্তার সঙ্গে তিনি কোনও আপোস করবেন না।
ইজরায়েলের অস্তিত্বের এই লড়াইয়ের শেষ কোথায়?
রাষ্ট্রসংঘে নেতানিয়াহুর এই অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ এত সহজে থামার নয়। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে এই লড়াই শুধু হামাসের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান নয়, এটি তাঁর ভাই ইয়োনির উত্তরাধিকার এবং ইজরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা করার সংকল্প।
৫৭ বছর আগে রামলার কমলালেবুর বাগানে ২১ বছর বয়সি এক প্যারাট্রুপার বলেছিলেন, ‘‘আমরা জিতব, আমাদের কাছে আর কোনও পথ নেই।’’ আজ সেই কথাই গোটা ইজরায়েলের সামরিক নীতির অংশ হয়ে উঠেছে। এবং যতদিন না হামাসের অস্তিত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে, ততদিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধের আগুন ঠান্ডা হতে দেবেন না।