Last Updated:
নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহের বিপরীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ভারতের অবস্থান কি সত্যিই আলাদা? শস্য, জ্বালানি ও পরিকাঠামোকে যুদ্ধের বাইরে রাখার ভারতের প্রস্তাব কীভাবে সংঘাতের পরিধি কমিয়ে শান্তির পথ তৈরি করতে পারে, তা নিয়েই এই বিশ্লেষণ।
প্রদীপ চক্রবর্ত্তী: এই সিজন চেঞ্জের সময় খুব জ্বরজ্বালা হয়। আমরা জানি। তাই শীতের মুখে ভাইরাল ফ্লু হলে খুব বেশি চিন্তিত কেউ হই না। অনেকদিন ধরে হাই টেম্পারেচর থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে একবার ব্লাড টেস্ট করিয়ে নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিজনাল ফ্লু হয়েছে। বুড়ো হচ্ছেন তো। রোগব্যাধি বাড়ে। তবে এই রোগটা গতবছর থেকে শুরু হয়েছে। অপারেশন সিঁদুরের পর থেকে। ট্রাম্পকে তোষামোদ করতে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বলে দেন, আপনার তো নোবেল পাওয়া উচিত। তারপর পাকিস্তান অফিসিয়ালি নোবেলের জন্যে ট্রাম্পের নাম সুপারিশ করে দেয়। তারপর একাধিক ছোট ছোট দেশ, আমেরিকার শুল্কের ভয়ে নোবেলের জন্যে ট্রাম্পের নাম সুপারিশ করে। কিন্তু, ট্রাম্প নোবেল পাননি। পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার মারিয়া করিনা মাচাদো। সেই মাচাদো আবার বললেন নোবেল আসলে ট্রাম্পেরই প্রাপ্য।
হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পকে নোবেল দেখিয়ে গুরুদক্ষিণাও দিয়ে এলেন। আর আমরা দেখলাম ট্রাম্প মাচাদোর শত্রু ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে এনে ভেনেজুয়েলার তেলের ভাণ্ডার দখল করে নিল। বিহারে একসময় এভাবে অপহরণ করা হতো বলে জনশ্রুতি শোনা যায়। তারপর ট্রাম্প ইরানে হামলা চালালেন। সারা পৃথিবীতে জ্বালানির সঙ্কট তৈরি করলেন। ইউরোপ থেকে যা ইঙ্গিত আসছে, ২০১৭-এ বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষও শুরু হয়ে যেতে পারে। শুল্কের নামে তোলাবাজি, তেলের জন্যে অপহরণ, পরমাণু অস্ত্রের মিথ্যে কথা রটিয়ে ইরানে হামলা। ইরানের স্কুলে বোমা ফেলে নিরীহ কন্যাসন্তানদের হত্যা। এবং এতকিছুর পরেও ট্রাম্পের ধারণা, তিনি এবছরও নোবেল শান্তি সম্মানের দাবিদার। নোবেল জ্বরে কাবু না হলে এমন প্রলাপ কেউ বলতে পারে?
মানুষ মেরে মানুষ বাঁচানোর দাবি করা। আমেরিকায় বলে এমনটাই রীতিনীতি। আবার নোবেল কমিটির মাপকাঠিও দুর্বোধ্য। কারণ বারাক ওবামা কিছু না করেই নোবেল শান্তি সম্মান পেয়ে গিয়েছিলেন। তারপর আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ায় সেনা অভিযানের অর্ডার দেন তিনি। ওই নোবেলের মাপকাঠিকে আপাতত পাশে সরিয়ে রেখে আমরা বরং একবার বিচার করে দেখি। শান্তি আসল চেষ্টাটা কোন পক্ষ থেকে হচ্ছে? প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি কয়েকদিন আগে বলেছেন, আন্তরিকভাবে বারবার যদি কেউ তাঁকে যুদ্ধ থামানোর জন্যে অনুরোধ করে থাকেন, সেটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আবার ইউক্রেন জানিয়েছে, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ভারত যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটাই সবচেয়ে যথাযথ। ভাবুন কাণ্ড, ট্রাম্প আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে মিটিং করে নিলেন। তারপরও ইউক্রেন বলছে, ভারতের প্রস্তাব যথাযথ। ভারত কী প্রস্তাব দিয়েছে? ভারত একবারও বলেনি কাল থেকে যুদ্ধ থামিয়ে দাও। সিজফায়ার কর। ভারত তিনদফা প্রস্তাব দিয়েছে।
মিশর, তুরস্ক বলেছিল শস্যের জাহাজের যেন হামলা না হয়। কারণ ওই দুই দেশ শস্য আমদানি করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি বাঁচানোর কথা বলেছিলেন। কারণ আমেরিকা শস্য স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের জ্বালানি চাই। ভারত জ্বালানি বাঁচাতে বলল। শস্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও শস্য বাঁচাতে বলল। কারণ ভারত বিশ্বে দুর্ভিক্ষ চায় না। এবং ভারত পরিকাঠামোও বাঁচাতে বলল। মানে এই প্রস্তাবে ভারতের কোনও স্বার্থ নেই। সেটা রাশিয়া-ইউক্রেন দুপক্ষই টের পেয়েছে। খেয়াল করে দেখুন। ভারত একবারও রাশিয়া-ইউক্রেনকে বলেনি, তোমরা যুদ্ধ করো না। ভারত রাশিয়াকে বলেনি ক্ষতিপূরণ দাও। ইউক্রেনকে বলেনি, তোমরা নেটোয় যোগ দিও না। ভারত যুদ্ধের বাইরে শস্য, জ্বালানি এবং বাণিজ্যিক পণ্যকে রাখতে বলেছে। তাতে কী হবে? প্রথমত ভারতের শর্তগুলি যদি দুই দেশ পালন করে তাহলে দুদেশের যুদ্ধক্ষেত্র অনেকটা ছোট হয়ে যাবে। এই মিসাইল হামলা, ড্রোন হামলা, বিমান হানা হবে না। সীমান্তে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যত পার লড়। দুদেশেরই লোকসংখ্যার অভাব রয়েছে। কত লড়বে? আর বাণিজ্য স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলে যুদ্ধ করার স্পৃহা চলে যাবে। মানুষই তখন যুদ্ধবিরোধী হয়ে উঠবে। খেয়াল করে দেখুন কর্মব্যস্ত মানুষরা কিন্তু, পরচর্চা করেন না। এবং যে সমাজে সকলের পেটে ভাত, আর সকলের হাতে কাজ রয়েছে, সেখানে গুন্ডা বদমাইশ বলে কিছু থাকে না। সকলেই কাজে ব্যস্ত থাকে। কাশ্মীরের সন্ত্রাস বা ছত্তীসগড়ের মাওবাদ। দুই হিংসা দমনেই উন্নয়নকেই হাতিয়ার করেছে ভারত সরকার। এবং সেই সফল ফর্মুলাতেই রুশ-ইউক্রেনের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলতে চায় ভারত।
