এর উত্তর খুঁজতে গেলে ইলন মাস্কের নিজের বক্তব্যের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। গত কয়েক বছরে তাঁর বিভিন্ন সংস্থার ব্যাপ্তি ও প্রভাব নিয়ে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এই ধনকুবের। সেই সব বক্তব্য সাধারণ নিয়ন্ত্রক বিধি মেনে চলার প্রশ্নের বাইরেও একাধিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর কাছে স্টারলিঙ্কের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বড় দাবি করেছিলেন ইলন মাস্ক। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি পরিষেবা বন্ধ করে দিলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর গোটা ফ্রন্টলাইন ভেঙে পড়তে পারে।
এক্স-এ মাস্ক লিখেছিলেন, “আমি পুতিনকে ইউক্রেন নিয়ে একের বিরুদ্ধে এক শারীরিক লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলাম। আর আমার স্টারলিঙ্ক ব্যবস্থা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড। আমি পরিষেবাটি বন্ধ করে দিলে তাদের গোটা ফ্রন্টলাইন ভেঙে পড়বে।”
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য স্টারলিঙ্কের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। সেনাদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা থেকে শুরু করে ড্রোন পরিচালনা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহার করা হয়েছে। পরে অবশ্য ইউক্রেনে স্টারলিঙ্ক টার্মিনালগুলির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন না বলে জানিয়েছিলেন মাস্ক।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে স্টারলিঙ্কের উপর এই নির্ভরশীলতা নেটওয়ার্কটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে, যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যক যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন এক বেসরকারি সংস্থার হাতে থাকলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা-ও সামনে এসেছে। বিশেষত, যে সংস্থার উপর সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই, তার হাতে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে সেই নির্ভরশীলতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২২ সালে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় দেশটির উপর স্টারলিঙ্ক পরিষেবা সক্রিয় করেছিলেন মাস্ক। এর ফলে যাঁদের কাছে স্টারলিঙ্কের টার্মিনাল ছিল, তাঁরা সরকারের আরোপিত ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অনলাইনে যোগাযোগ করার সুযোগ পান।
এর তিন বছর পর, ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরুর এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে ফের স্টারলিঙ্কের ক্ষমতা ও বিস্তার নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন মাস্ক। ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ইন্টারনেট পরিষেবা দেওয়ার আহ্বানের জবাবে এক্স-এ তিনি লেখেন, “বিমগুলি চালু রয়েছে।”
যুদ্ধ চলাকালীন ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সংঘাতের পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎপর ছিল দেশটির প্রশাসন। সেই সময়ই প্রকাশ্যে ইরানের আকাশে স্টারলিঙ্কের স্যাটেলাইট পরিষেবা উপলব্ধ থাকার কথা ঘোষণা করেন মাস্ক।
‘সম্ভবত আমার মাথায় বিশ্বের যে কোনও মানুষের চেয়ে বেশি রিয়েল-টাইম অর্থনৈতিক তথ্য রয়েছে’
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতা নিয়ে বড়সড় দাবি করেছিলেন মাস্ক।
এক্স-এ তিনি লিখেছিলেন, “টেসলা, স্টারলিঙ্ক এবং টুইটারের মাধ্যমে সম্ভবত বিশ্বের অন্য যে কোনও মানুষের তুলনায় আমার কাছে এক জায়গায় আরও বেশি রিয়েল-টাইম বৈশ্বিক অর্থনৈতিক তথ্য রয়েছে।”
তাঁর এই মন্তব্যের পিছনে ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা টেসলা, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিঙ্ক এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টুইটারের মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ তথ্য।
তবে বিপুল তথ্যভাণ্ডারে নিজের নাগালের কথা মাস্ক যেভাবে তুলে ধরেছিলেন, তাতে ভারতের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। স্টারলিঙ্ক ভারতে কাজ শুরু করলে সেই পরিষেবার মাধ্যমে সংগৃহীত সংবেদনশীল তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে? দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির নজরদারির বাইরে সেই তথ্যের নাগাল পাওয়া বা তা ব্যবহার করার কোনও সম্ভাবনা থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
স্টারলিঙ্কের বিস্তার নিয়ে মাস্কের দাবির সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে গিয়েছে। মাদক পাচারকারী এবং সন্দেহভাজন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তদন্তের সময় স্টারলিঙ্কের যন্ত্রপাতি উদ্ধার হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মায়ানমারের সঙ্গে যোগ থাকা একটি জাহাজ থেকে প্রায় ৬,০০০ কেজি মেথামফেটামিন বাজেয়াপ্ত করেন তদন্তকারীরা। ওই জাহাজ থেকে একটি স্টারলিঙ্ক ডিভাইসও উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, নেভিগেশন এবং যোগাযোগের কাজে সেটি ব্যবহার করছিল মাদক পাচারকারীরা।
প্রায় একই সময়ে মণিপুরে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ভারতীয় সেনা ও অসম রাইফেলসের হাতে স্টারলিঙ্কের লোগোযুক্ত সরঞ্জাম উদ্ধার হয়। তার মধ্যে ছিল একটি স্যাটেলাইট ডিশ এবং রাউটার।
মণিপুরে স্টারলিঙ্কের যন্ত্রপাতি উদ্ধারের পর ভারতে সংস্থাটির পরিষেবা চালু থাকা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়। সেই সময় এই সংক্রান্ত দাবি খারিজ করে দেন মাস্ক।
এক্স-এ তিনি লেখেন, “এটি মিথ্যা। ভারতের উপর দিয়ে স্টারলিঙ্কের স্যাটেলাইট বিম বন্ধ রাখা হয়েছে।” যদিও উদ্ধার হওয়া যন্ত্রপাতি থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি যে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা সক্রিয় ছিল, তবে এর পরেই ভারতীয় তদন্তকারীদের সঙ্গে সংস্থাটির সহযোগিতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলির আসল ক্রেতাদের পরিচয় জানতে চেয়েও তথ্য পায়নি ভারত সরকার। তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইনের কথা উল্লেখ করে সেই তথ্য দিতে অস্বীকার করেছিল স্টারলিঙ্ক।
সরকারি এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “আন্দামানে মাদক পাচারকারীদের কাছ থেকে এই ডিভাইসগুলি উদ্ধারের পর সরকার স্টারলিঙ্কের কাছে সেগুলির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য চেয়েছিল। কিন্তু তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইনের কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি তা দিতে অস্বীকার করে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক টেলিযোগাযোগ দফতরকে (DoT) উপযুক্ত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়।
ভারতে স্যাটেলাইট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির জন্য একাধিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইন মেনে যোগাযোগে আড়ি পাতার ব্যবস্থা, দেশের অভ্যন্তরে তথ্য সংরক্ষণ, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং অনুমোদিত সংস্থার নির্দেশে প্রয়োজনে পরিষেবা বন্ধ করার সক্ষমতা।
এ ছাড়াও স্যাটেলাইট গেটওয়ে এবং যোগাযোগের তথ্য কোন পথে আদানপ্রদান করা হবে, তা নিয়েও সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় কেন্দ্র। ভারতের আইনি এক্তিয়ারের বাইরে যাতে অনুমতি ছাড়া তথ্য পাঠানো না যায়, সেই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্টারলিঙ্ক ইতিমধ্যেই গ্লোবাল মোবাইল পার্সোনাল কমিউনিকেশনস বাই স্যাটেলাইট (GMPCS) লাইসেন্স পেয়েছে। পাশাপাশি, ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা ও পরিষেবা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন-স্পেস (IN-SPACe)-এর কাছ থেকেও অনুমোদন মিলেছে। তবে এখনও চূড়ান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দের প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
গত ৯ অক্টোবর কেন্দ্রীয় যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া জানিয়েছিলেন, তিনটি স্যাটেলাইট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা লাইসেন্স পেয়েছে। তবে নির্ধারিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ এবং স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সংস্থাই বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু করতে পারবে না।
ফলে ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালুর ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত শর্ত পূরণ এবং চূড়ান্ত সরকারি ছাড়পত্র পাওয়া। বিদেশি মালিকানাধীন এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেই প্রশ্নও তাই গুরুত্ব পাচ্ছে।