গুরুতর অসুস্থতার কারণে ওই রোগীর চিকিৎসা চলছিল। অক্টোবরের গোড়ার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ঘটনাটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কারণ, এখনও পর্যন্ত শামোন্ডা ভাইরাসকে এমন একটি ভাইরাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা পশুদের সংক্রমিত করে এবং মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটায় না।
এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কোনও চিহ্নিত (Identified) ঝুঁকি নেই। কীভাবে ওই রোগী সংক্রমিত হয়েছিলেন এবং তাঁর অসুস্থতার ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা বোঝার জন্য তদন্ত চলছে।
ফ্রান্সের কৃষি মন্ত্রক জানিয়েছে, ওই রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। মন্ত্রকের মতে, এখনও পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত করছে যে, মৃত্যুর আগে রোগীর মস্তিষ্কে যে জটিলতা দেখা দিয়েছিল, তা সম্ভবত শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গেই যুক্ত ছিল।
কীভাবে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ওই রোগী?
ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে প্রাথমিকভাবে যে ধারণাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হল, পূর্ব ফ্রান্সে কোনও পতঙ্গের কামড়ের পর ওই রোগী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
২০২৬ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে ওই অঞ্চলের পশুদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, Culicoides প্রজাতির এক ধরনের ক্ষুদ্র দংশনকারী পতঙ্গের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে থাকতে পারে। এই অতি ক্ষুদ্র পতঙ্গটি পশুদের মধ্যে শামোন্ডা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য পরিচিত।
তবে কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে জানিয়েছে, ঠিক কী পরিস্থিতিতে ওই রোগী সংক্রমিত হয়েছিলেন, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
বর্তমানে চিকিৎসাগত, পরীক্ষাগারভিত্তিক এবং মহামারিবিদ্যাগত তদন্ত চলছে। ফ্রান্সের আধিকারিকরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (ECDC) সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন।
শামোন্ডা ভাইরাস কী?
শামোন্ডা হল Orthobunyavirus গোষ্ঠীর একটি পতঙ্গবাহিত ভাইরাস। এটি মূলত গবাদি পশু, বিশেষ করে গরুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং দংশনকারী ক্ষুদ্র পতঙ্গের মাধ্যমে ছড়ায়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নাইজেরিয়ায় প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছিল। তারপর থেকে আফ্রিকার কয়েকটি অঞ্চল এবং জাপানে পশুদের শরীরে বিক্ষিপ্তভাবে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে।
ফ্রান্সে এই ঘটনা সামনে আসার আগে পর্যন্ত শামোন্ডা ভাইরাসকে পশুদের মধ্যে সংক্রমণকারী ভাইরাস হিসেবেই জানা ছিল। মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণের কোনও নথিভুক্ত ঘটনা ছিল না।
এই ভাইরাসে কী কী উপসর্গ দেখা দেয়?
গরুর শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে জ্বর, অবসন্নতা এবং ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এই সংক্রমণের ফলে দুগ্ধ খামারগুলিতেও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। সংক্রমিত গরুর দুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
গরুকেই এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এখনও পর্যন্ত পাওয়া তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে ছোট আকারের জাবরকাটা প্রাণী এবং ঘোড়ার শরীরেও এই ভাইরাসের সংক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছে।
বর্তমানে মানুষের শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণের নির্দিষ্ট উপসর্গের কোনও প্রতিষ্ঠিত তালিকা নেই। কারণ, ফ্রান্সের ঘটনাটিই মানুষের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা।
পশ্চিম ইউরোপে পৌঁছে গেল শামোন্ডা ভাইরাস:
চলতি বছর প্রথমবারের মতো পশ্চিম ইউরোপে এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
এর আগে মূলত অন্যান্য অঞ্চলের পশুদের মধ্যে সংক্রমণের সঙ্গে শামোন্ডা ভাইরাসের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। তবে গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ জার্মানি, সুইৎজারল্যান্ড, ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়।
ইউরোপে পশুদের মধ্যে এই ভাইরাসের বিস্তার স্বাস্থ্য ও পশুচিকিৎসা সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষকে নতুন সংক্রমণের ঘটনাগুলির উপর কড়া নজরদারি চালাতে বাধ্য করেছে। তবে ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গুরুতরভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া একজন রোগীর শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, বর্তমানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ওই রোগীর আগে থেকে থাকা শারীরিক অসুস্থতা এই অস্বাভাবিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা পালন করেছিল কি না এবং ঠিক কীভাবে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল, তা জানতে কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
আপাতত আধিকারিকদের বক্তব্য, এই ঘটনাটি ব্যতিক্রমী। তবে আরও পরীক্ষাগারভিত্তিক, চিকিৎসাগত এবং মহামারিবিদ্যাগত তদন্তের মাধ্যমে এই ভাইরাস সম্পর্কে এবং মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।