পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমিত জোগানের কারণে এমনিতেই সমস্যায় রয়েছেন বহু পরিবার। তার উপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এলপিজি ডিলাররা হাজার হাজার দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদে নেমেছেন। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি সংস্থাগুলি তাঁদের হয়রানি করছে। অথচ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ করছে না প্রশাসন।
এদিকে, এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের গদর জেলার গাবদ-রিমদান সীমান্ত পারাপারের পথ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ফের খুলে দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত বন্ধ থাকায় বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছিল, আটকে পড়েছিল পণ্যবাহী গাড়ি। শীতের আগে এলপিজি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছিল। শনিবার বাণিজ্য ফের শুরু হলে ১৬ অক্টোবর বা তার আগের তারিখে ইস্যু করা কনসাইনমেন্ট নোট-সহ বাণিজ্যিক পণ্য পারাপারের অনুমতি দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ডন। তবে সীমান্ত খুললেও এলপিজি সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধির সংকট এখনও অব্যাহত।
দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি সংস্থাগুলির হয়রানি এবং অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত এলপিজি সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার খুচরো এলপিজি বিক্রেতা দোকান বন্ধ রেখেছেন।
লাহোর-সহ দেশের একাধিক শহরে প্রায় ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০টি এলপিজি দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে গ্যাসের জোগান পেতে সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ। কয়েক দিন ধরে লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধির মধ্যেই এই ধর্মঘট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দোকানদার কাশিফ বিলাল আসগরের অভিযোগ, PERA ফোর্স এবং সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা খুচরো বিক্রেতাদের কাছ থেকে এলপিজি ভরার যন্ত্র বাজেয়াপ্ত করেছেন। তাঁর দাবি, প্রতিটি পাম্পের দাম ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ পাকিস্তানি রুপি। অথচ দোকানদারদের ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ রুপি পর্যন্ত জরিমানা করা হচ্ছে।
আসগর আরও অভিযোগ করেছেন, তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা OGRA এলপিজি সংস্থা ও প্ল্যান্টগুলির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগে যথাযথ পদক্ষেপ করছে না। বরং ছোট দোকানদারদের উপরেই নজরদারি ও জরিমানা করা হচ্ছে। ডিলারদের দাবি, একের পর এক জরিমানা এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া তাঁদের আর কোনও উপায় নেই।
এই ধর্মঘটের জেরে রান্নার গ্যাসের জোগান আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। দৈনন্দিন রান্নার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে কয়লা ও শুকনো কাঠ ব্যবহার করছেন কিছু পরিবার।
দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদন অনুসারে, গত পাঁচ থেকে ছয় দিনে এলপিজি-র দাম দ্রুত বেড়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার পিছনে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনার জেরে তাফতান সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
OGRA-র এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করা হয়। বাকি ৩০ শতাংশ আসে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে।
চলতি মাসে OGRA এলপিজি-র সরকারি দাম কেজিপ্রতি ২৭৯.৩৪ পাকিস্তানি রুপি নির্ধারণ করলেও বাজারে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বিভিন্ন বাজারে কেজিপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬০০ রুপি দরে বিকোচ্ছে রান্নার গ্যাস। পেশোয়ারেও দাম প্রায় ৬০০ রুপি প্রতি কেজি। খাইবার পাখতুনখোয়ার কিছু উত্তরাঞ্চলে সেই দাম বেড়ে ৭৫০ রুপি পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এই দামে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য ১০ হাজার রুপিরও বেশি খরচ হতে পারে। ফলে রান্নার জন্য এলপিজি-র উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির উপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।
এলপিজি-র জন্য নির্ধারিত সরকারি দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত সংস্থা ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে OGRA এখনও প্রস্তাবিত অভিযান শুরু করেনি। আধিকারিকদের আশঙ্কা, কঠোর পদক্ষেপ করা হলে ফের ধর্মঘট শুরু হতে পারে। তাতে গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে।
OGRA-র এক আধিকারিক সতর্ক করে জানিয়েছেন, সরবরাহের সমস্যা আরও বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত বাজারগুলিতে এলপিজি-র দাম কেজিপ্রতি ৭০০ রুপিরও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, OGRA-র এক মুখপাত্র স্বীকার করেছেন, তাফতান সীমান্ত বন্ধ থাকায় সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। দ্রুত সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এলপিজি-র দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে খাইবার পাখতুনখোয়ার গরীব পরিবারগুলির উপর। ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি আগে থেকেই রয়েছে। ফলে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পেশোয়ারের আশপাশের গ্রামীণ এলাকা এবং বিভিন্ন জনবসতিতে এলপিজি-র দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেকেই জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানও সেখানে পর্যাপ্ত নয়।
একদিকে ডিলারদের ধর্মঘট, অন্যদিকে সরবরাহে বিঘ্ন এবং সরকারি দামের তুলনায় বাজারে অনেক বেশি দামে গ্যাস বিক্রি—সব মিলিয়ে রান্নার জ্বালানি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ইরানের সঙ্গে গাবদ-রিমদান সীমান্ত ফের খুলে দেওয়ায় বাণিজ্য শুরু হলেও এলপিজি-র জোগান ও দামের উপর তার তাৎক্ষণিক প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।