প্রথম নজরে সংখ্যাগুলি হয়তো বিশাল ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয় না। কিন্তু নেতৃত্বের পছন্দ, সামাজিক সমীকরণ এবং আসন রূপান্তরের বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি খুব একটা কাছাকাছি লড়াই নয়, বরং একটি সুসংহত জনসমর্থনের প্রতিফলন। CNN-News18-এর জন্য VoteVibe-এর করা এই এক্সিট পোল তাই অনেকটাই একতরফা ফলাফলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সমীক্ষার মূল প্রশ্ন ছিল—অসমের নেতৃত্বে কাকে আবার দেখতে চান মানুষ? সেখানে ৫১.২ শতাংশ মানুষ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার পক্ষে মত দিয়েছেন, যেখানে কংগ্রেসের গৌরব গগৈ পেয়েছেন ৩৭.২ শতাংশ সমর্থন। অর্থাৎ প্রায় ১৪ শতাংশের ব্যবধান, যা শর্মার স্পষ্ট এগিয়ে থাকার প্রমাণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সমর্থন কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্যের প্রায় সব অঞ্চল, লিঙ্গ এবং অধিকাংশ বয়সভিত্তিক শ্রেণিতেই তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
ভোট শতাংশে কাছাকাছি, কিন্তু সামাজিক সমীকরণে স্পষ্ট বিভাজন
মোট ভোট শতাংশে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট (BJP+) পেয়েছে ৪৬.১ শতাংশ এবং কংগ্রেস জোট পেয়েছে ৪১.২ শতাংশ। সংখ্যাগুলি কাছাকাছি হলেও সামাজিক ভিত্তিতে বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে। তফসিলি জাতি (SC)-র মধ্যে ৬৮.৮%, তফসিলি জনজাতি (ST)-র মধ্যে ৬৬.৮%, ওবিসি (OBC)-র মধ্যে ৬৬.৫% এবং উচ্চবর্ণের মধ্যে ৬৬.৭% ভোট বিজেপি জোটের পক্ষে গেছে।
অন্যদিকে, প্রায় ৭১.২% মুসলিম ভোটার কংগ্রেস জোটকে সমর্থন করেছেন, যা ধর্মভিত্তিক ভোট বিভাজনের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
আসন পূর্বাভাসে একতরফা চিত্র
১২৬ আসনের অসম বিধানসভায় এনডিএ পেতে পারে ৯০ থেকে ১০০টি আসন (গড়ে ৯৫)। অন্যদিকে কংগ্রেস জোট সীমাবদ্ধ থাকতে পারে ২৩ থেকে ৩৩টি আসনে (গড়ে ২৮)। বিজেপি একাই পেতে পারে ৭২ থেকে ৭৮টি আসন, যা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট।
‘হিমন্ত ফ্যাক্টর’ কেন এত শক্তিশালী?
এই ফলাফলের পেছনে কী কারণ, সেটাও স্পষ্ট করেছে এক্সিট পোল। ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল বেকারত্ব (২৪%) এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ (১৭.৮%)—যা বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছে। ফলে নির্বাচন এমন এক মঞ্চে লড়া হয়েছে, যা শাসক দলের পক্ষে অনুকূল।
শুধু ইস্যু নয়, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও বড় ভূমিকা নিয়েছে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজেকে একজন দৃশ্যমান ও দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। জনসংযোগ, সরাসরি যোগাযোগ এবং দৃঢ় নেতৃত্বের ভাবমূর্তি তাঁকে আলাদা জায়গা দিয়েছে।
সরকারি প্রকল্প, বিশেষ করে মহিলা ও আর্থিকভাবে দুর্বলদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি, এবং SC/ST/OBC সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ—এই সবই তাঁর সমর্থনভিত্তি আরও মজবুত করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনুপ্রবেশ ও অসমের পরিচয় রক্ষার প্রশ্নে তাঁর কড়া অবস্থান। এই ইস্যুতে তিনি বিভিন্ন জাতপাতের হিন্দু ভোটকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজেপির কাছে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা উত্তর-পূর্বে দলের উত্থানের প্রধান মুখ এবং কার্যকর প্রশাসনের প্রতীক। অন্যদিকে বিরোধীদের মতে, তিনি ‘কঠোর রাজনীতি’-র প্রতিচ্ছবি, যেখানে উচ্ছেদ অভিযান, পরিচয় রাজনীতি এবং কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ গুরুত্ব পায়।
সম্প্রতি এক প্রচারে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “অনুপ্রবেশকারীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেব,” যা তাঁর কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। পুনর্নির্বাচিত হলে এই ধরনের অভিযান আরও জোরদার করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, এক্সিট পোলের ইঙ্গিত বলছে—অসমে এবার বিজেপির ঝড়ো জয় আসতে পারে, যার কেন্দ্রে রয়েছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
(বিঃদ্রঃ- এক্সিট পোল কখনই চূড়ান্ত ফলাফল নয়। এই ফল মিলতেও পারে আবার নাও পারে।)