উত্তর ভারতে এখন চলছে ‘নৌতপা’— ঐতিহ্যগতভাবে গ্রীষ্মের সবচেয়ে উষ্ণ ৯ দিনের সময়কাল। এই সময়েই পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কিছু এলাকায় পারদ ৪৮ ডিগ্রির কাছাকাছিও পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা আবহাওয়াবিদদের।
এর আগের মাসেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের তালিকায় একদিনে সবকটিই ছিল ভারতের, যা দেশের তাপ সঙ্কটের গভীরতাকেই স্পষ্ট করেছে।
কেন ইউরোপে এত তীব্র গরম?
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা উষ্ণ বায়ুকে আটকে রাখা একটি বিশাল উচ্চচাপ বলয়ের কারণেই ইউরোপে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ তৈরি হয়েছে। এই উচ্চচাপ বলয় কার্যত ঢাকনার মতো কাজ করছে, ফলে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করতে পারছে না এবং পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল সাময়িক আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, বরং বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত। মার্কিন সংস্থা NOAA-র তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে ইউরোপই বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হওয়া মহাদেশ। এশিয়াও খুব পিছিয়ে নেই।
লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর ইউরোপের বহু অঞ্চল এখন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো গরম গ্রীষ্মের মুখোমুখি হচ্ছে। অথচ সেই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী গরম সহ্য করার মতো পরিকাঠামো— বাড়ি, অফিস বা গণপরিবহণ— কখনও তৈরি করা হয়নি।
জলবায়ুবিদদের সতর্কবার্তা, আগামী দিনে ব্রিটেনে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। ফলে ৪০ ডিগ্রির তাপপ্রবাহের মতো একসময় অকল্পনীয় পরিস্থিতিও আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে ইউরোপের জীবনযাত্রাতেও। যেখানে একসময় এয়ার কন্ডিশনারকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা হত, সেখানে এখন বারবারের তাপপ্রবাহের কারণে মানুষ ক্রমশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে বহুস্তরীয় জলবায়ু সঙ্কট
ইউরোপের মতোই ভারতে তীব্র গরমের পিছনেও রয়েছে একাধিক কারণ। আবহাওয়াবিদদের মতে, একটি স্থায়ী ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয় দেশের বিস্তীর্ণ অংশে গরম বাতাস আটকে রেখেছে। এর ফলে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ মিলছে না এবং প্রাক-বর্ষার মেঘ তৈরিও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এল নিনোর প্রভাব। এর জেরে মৌসুমি বৃষ্টির আগমন দুর্বল হয়েছে এবং উত্তর ভারতের তাপ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
এছাড়াও এ বছর পশ্চিমী ঝঞ্ঝার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সাধারণত হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা এই আবহাওয়া ব্যবস্থা উত্তর ভারতে আর্দ্রতা ও ঠান্ডা হাওয়া নিয়ে আসে। কিন্তু তা না থাকায় উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা অস্বাভাবিকভাবে শুষ্ক হয়ে পড়েছে এবং দ্রুত তাপমাত্রা বেড়েছে।
অন্য দিকে, মধ্য ও উপকূলীয় ভারতে অতিরিক্ত তাপমাত্রার সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা মিলে তৈরি করছে বিপজ্জনক ‘ওয়েট-বাল্ব’ পরিস্থিতি। এই অবস্থায় শরীরের ঘাম ঠিকমতো বাষ্পীভূত হতে পারে না, ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।