প্রায় পাঁচ দশক আগে থেকেই জৈব জ্বালানির ব্যবহার শুরু করে ব্রাজিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশটি ধাপে ধাপে E20 থেকে E85 এবং E100-এর মতো উচ্চমাত্রার ইথানল মিশ্রিত জ্বালানিতে সফলভাবে রূপান্তর ঘটিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জন্যও এই মডেল একটি কার্যকর রোডম্যাপ হতে পারে।
ভারত বনাম ব্রাজিল: কোথায় পার্থক্য?
১৯৭৩ সালের তেল সংকটের পর ব্রাজিল ইথানলভিত্তিক জ্বালানির পরিকাঠামো গড়ে তোলে। অন্যদিকে, বছরে প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকার জ্বালানি আমদানি বিল কমানোর লক্ষ্যেই ভারত ইথানল ব্যবহারে জোর দিচ্ছে।
মাইলেজ কমা ও ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কা
ভারতে সাধারণ পেট্রোলচালিত গাড়িতে E20 ব্যবহারের ফলে ৫ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত মাইলেজ কমে যেতে পারে। এছাড়া ২০২৩ সালের আগে তৈরি BS3 ও BS4 গাড়িগুলিতে দীর্ঘদিন E20 ব্যবহার করলে ফুয়েল পাম্প ও রাবারের যন্ত্রাংশে ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়িতে বিশেষ সেন্সর থাকে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানিতে ইথানল ও পেট্রোলের অনুপাত শনাক্ত করে ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালী সামঞ্জস্য করে। ফলে মাইলেজ বা ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়।
ভারতেও E85 ও E100 জ্বালানি চালুর প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যেই মারুতি সুজুকি ও হিরো মোটোকর্প তাদের প্রথম বাণিজ্যিক ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে।
দাম কম না হলে বাড়বে না ব্যবহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে উচ্চমাত্রার ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির দাম পেট্রোলের সমান হওয়ায় অনেকেই তা ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। কারণ একই দামে কম মাইলেজ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ব্রাজিলে অবশ্য কর ছাড়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে ইথানলকে পেট্রোলের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ সস্তা রাখা হয়। ফলে সেখানে গ্রাহকদের মধ্যে এই জ্বালানির ব্যবহার অনেক বেশি জনপ্রিয়।
ধাপে ধাপে পরিবর্তনের উপর জোর
ভারতে খুব দ্রুত E20 চালু হওয়া এবং E25 পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় অনেক গাড়ির মালিকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ব্রাজিল কয়েক দশক ধরে ধাপে ধাপে এই পরিবর্তন এনেছে। গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে পুরনো গাড়িগুলিকে স্বাভাবিকভাবে বাজার থেকে বিদায় নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরই উচ্চমাত্রার ইথানল মিশ্রণের দিকে এগিয়েছে দেশটি।
ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের মতো ভারত সরাসরি সেই মডেল অনুসরণ করতে পারবে না। কারণ ব্রাজিলে বৃষ্টিনির্ভর আখ চাষ ব্যাপক হলেও ভারতে আখ চাষ অত্যন্ত জলনির্ভর এবং খরাপ্রবণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত। পাশাপাশি ভুট্টা বা ভাঙা চালের মতো খাদ্যশস্য জ্বালানি তৈরিতে বেশি ব্যবহার করলে খাদ্য নিরাপত্তা এবং শস্যের দামের উপরও প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া E85-এর মতো উচ্চমাত্রার ইথানল জ্বালানি সরবরাহের জন্য আলাদা স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন ও ফুয়েল ডিসপেনসার প্রয়োজন। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে ৫,০০০টি E85 ফুয়েল স্টেশন তৈরির লক্ষ্য থাকলেও, তা বাস্তবায়নে তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হবে।
কী পথ নিতে পারে ভারত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের উচিত নয় ব্রাজিলের মডেল হুবহু অনুসরণ করা। বরং ইথানলভিত্তিক ফ্লেক্স-ফুয়েল প্রযুক্তির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), সিএনজি এবং গ্রিন হাইড্রোজেন-এর মতো বিকল্প জ্বালানিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এতে দূষণ কমানোর পাশাপাশি আমদানি করা জ্বালানির উপর নির্ভরতাও ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে।