শনিবার অমরজি পাটিদার সাঁওলিয়াজি মন্দিরে পৌঁছেছিলেন। তিনি জানান, ২৩ জুলাই রেজিস্ট্রি অফিসে ভগবান সাঁওলিয়া সেঠের নামে জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। এই কাজ শেষ করতে তাঁকে ১০ বছর ধরে নিরন্তর চেষ্টা ও অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে।
দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর পরম বন্ধু সুদামার বন্ধুত্ব এবং আত্মত্যাগের কাহিনি আজও ভক্তিভরে শোনা হয়। কিন্তু কলিযুগে রাজস্থান থেকে ভক্তি, ত্যাগ এবং সমর্পণের এমনই এক অনন্য নজির সামনে এসেছে। দুঙ্গারপুর জেলার এক সাধারণ কৃষক তাঁর সারা জীবনের উপার্জন এবং প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পত্তি ভগবান সাঁওলিয়া সেঠের চরণে সমর্পণ করেছেন। বিশেষ বিষয় হল, এই সংকল্প পূরণ করতে তাঁকে টানা ১০ বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং মন্দির ও প্রশাসনিক দফতরের ১০০টিরও বেশি বার চক্কর কাটতে হয়েছে। রাজস্থানের দুঙ্গারপুর জেলার আসপুর তহসিলের খেড়া সামোর গ্রামের বাসিন্দা অমরজি গৌতম পাটিদার অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন।
ধুতি-কুর্তা পরিহিত অমরজির বাবা-মা দু’জনেই প্রয়াত। তিনি একাই থাকেন। ২০১৬ সালে তিনি সংকল্প নিয়েছিলেন যে, তাঁর সমস্ত জমি ও বাড়ি ভগবান সাঁওলিয়া সেঠকে দান করবেন। তাঁর এই সম্পত্তির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। তবে সিদ্ধান্তটি যত বড় ছিল, তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। জমির উপর ঋণ থাকা, বিভিন্ন খতিয়ানে জমি নথিভুক্ত থাকা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে দানের কাজ বছরের পর বছর আটকে ছিল। এই সময়ে একাধিক জেলা কালেক্টর, মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক এবং শ্রী সাঁওলিয়া মন্দির মণ্ডলের সভাপতি বদলেছেন, কিন্তু অমরজির সংকল্প একটুও বদলায়নি। গত ১০ বছরে তিনি সাঁওলিয়াজি ও চিতোরগড়ে ১০০-রও বেশিবার যাতায়াত করেছেন।
ভগবান সাঁওলিয়া সেঠের নামে ১০.১৫ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি:
অবশেষে মন্দির প্রশাসন, স্থানীয় মানুষ এবং শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় তাঁর ১০.১৫ বিঘা জমির রেজিস্ট্রি ভগবান সাঁওলিয়া সেঠের নামে সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে বহু বছরের পুরনো তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়।
অমরজির এই নিঃস্বার্থ ভক্তিতে গ্রামের মানুষ এবং আশপাশের এলাকাবাসীরাও আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। জমির ঋণ শোধ করা এবং বিভিন্ন খতিয়ানে থাকা জমিকে একত্র করার প্রক্রিয়ায় অনেকেই আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। প্রাক্তন জেলা শিক্ষা আধিকারিক গিরিজা ম্যাডাম, ভারত রাওয়াল, কেবলজি এবং এমনকি কুয়েতে বসবাসকারী দেবীলালও আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে, আইনজীবী ভালজি পাটিদার কোনও পারিশ্রমিক না নিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রেজিস্ট্রি-সংক্রান্ত সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেন।
দান করা জমিতে বিশাল গোশালা নির্মাণের ইচ্ছা:
অমরজি পাটিদার শুধু সম্পত্তি দান করেই থেমে থাকেননি। তাঁর খেতে থাকা প্রায় ৩০টি আমগাছের ফলও তিনি কখনও বিক্রি করেন না। তাঁর ইচ্ছা, দান করা এই জমিতে ভবিষ্যতে একটি বৃহৎ গোশালা নির্মাণ করা হোক, যাতে তা সমাজ ও গোরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি এখন তাঁর মায়ের এক কেজি রুপোর গয়নাও ভগবান সাঁওলিয়া সেঠের চরণে অর্পণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অমরজি পাটিদারের নিষ্ঠা, ভক্তি ও আত্মসমর্পণ গড়েছে অনন্য নজির:
শ্রী সাঁওলিয়া মন্দির মণ্ডলের প্রশাসনিক আধিকারিক রাজেন্দ্র সিং-ও এই দানকে ভক্তি, আস্থা এবং আত্মসমর্পণের এক অনন্য নজির বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, অমরজি পাটিদারের এই অবদান শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সমাজের জন্যও অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।
অমরজি গৌতম পাটিদারের এই কাহিনি প্রমাণ করে, যখন বিশ্বাস অটুট থাকে এবং সংকল্প দৃঢ় হয়, তখন বছরের পর বছর ধরে আসা কঠিন বাধাও মানুষকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। আর সেই কারণেই আজ দুঙ্গারপুরের এই কৃষককে অনেকে ‘কলিযুগের সুদামা’ বলে স্মরণ করছেন। তাঁর নিঃস্বার্থ ভক্তি ও ত্যাগের এই বিরল দৃষ্টান্ত আজ গোটা রাজস্থানে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।