চার মাস ধরে চলা যুদ্ধে ইতি টেনে অবশেষে শান্তি সমঝোতায় সই করেছে আমেরিকা এবং ইরান। খুলে গিয়েছে হরমুজ প্রণালী। কিন্তু, চুক্তি সইয়ের পরও অশান্তি পুরোপুরি থামেনি। শনিবার, ২৭ জুনও একে অপরকে নিশানা করেছে দুই গোষ্ঠী। ফলে, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরলেও, অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে। গত কয়েক মাসে পশ্চিম এশিয়ার এই অশান্তির প্রভাব সরাসরি পড়েছে গোটা দুনিয়ার জ্বালানির বাজারে। মাসের পর মাস হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় তীব্র জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে। একাধিক দেশে তেলের অভাব দেখা দিয়েছে। আকাশ ছুঁয়েছে পেট্রোল-ডিজেলের দাম। কিন্তু সঙ্কটের এই দিনেও ভারতবাসীকে সেভাবে ঝড়-ঝাপটার মুখে পড়তে হয়নি। এ দেশে না তো সেভাবে তেলের দাম বেড়েছে, না রান্নার গ্যাসের সেরকম কোনও সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেন?
জ্বালানি সঙ্কটেও নিশ্চিন্তে ভারত:
ভারতে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল লাগে, তার ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় ৷
ভারত পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারী দেশ।
LPG-র ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়।
এর বেশিরভাগটাই আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে, হরমুজ প্রণালী হয়ে।
একদিকে পারস্য উপসাগর। অন্যদিকে, ওমান উপসাগর। মাঝে এই সরু জায়গাটি হল হরমুজ প্রণালী। পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল বা গ্যাস নিয়ে জাহাজ এই হরমুজ প্রণালী হয়ে আরব সাগরে আসে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৷ আমেরিকা ইরানে হামলা করার পরই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তেহরান। জ্বালানির সঙ্কট শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০ ডলার প্রতি ব্যারেল থেকে বেড়ে ১২০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছে যায়।
এখন প্রশ্ন হল, ভারত এই তীব্র সঙ্কটের মোকাবিলা করল কী ভাবে? কোন কৌশলে?
ভারতের জ্বালানি-কৌশল:
কঠিন এই পরিস্থিতিতে ভারত বহুমুখী কৌশল নেয়। যা হল, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব, বাড়তি খরচে লাগাম, দ্রুত ঘরোয়া উৎপাদন বাড়ানো এবং জ্বালানি-কূটনীতি ৷
প্ল্যানিংয়ে বাজিমাত:
সবার আগে অবশ্যই মোদি সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা যা বিপদের দিনে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের সামনে। এককালে ২৭টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করত ভারত। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪১। হরমুজ প্রণালী ছাড়া আরও একাধিক সমুদ্র পথে এখন তেল আসে ভারতে। তাই তেলের থেকেও বড় সমস্যা রান্নার গ্যাস। অর্ধেকের বেশি এলপিজি পশ্চিম এশিয়া থেকে আমদানি করে ভারত। তাই, হরমুজ বন্ধ হওয়ার আট দিনের মধ্যেই এলপিজি কন্ট্রোল অর্ডার ইস্যু করে ভারত সরকার। ঘরোয়া রিফাইনারিগুলিকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সাত দিনের মধ্যে ঘরোয়া উৎপাদন দিনে ৩৫ হাজার টন থেকে বেড়ে ৫৪ হাজার টনে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যাতে রান্নার গ্যাস ঠিকমতো পায়, তার জন্য বাণিজ্যিক গ্যাসের ব্যবহারে লাগাম টানা হয়।
আমদানির খরচ বেড়েছে হুহু করে। কিন্তু, জনতার উপর সেই খরচের বোঝা চাপতে দেয়নি সরকার। এর জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সামাল দিতে হয়েছে রাজকোষ থেকে।
বোঝা চাপেনি জনতার উপর:
প্রথমেই ধরা যাক রান্নার গ্যাসের কথা। যুদ্ধের সময় সিলিন্ডার পিছু সরকারকে খরচ করতে হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু, সাধারণ মানুষ সিলিন্ডার পেয়েছেন ৯৫০ টাকার মধ্যে। পেট্রোল এবং ডিজেলের উপর শুল্কওে কমিয়েছে সরকার। পেট্রোল-ডিজেলের উপর থেকে শুল্ক কমানোয় রাজকোষের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তেল সংস্থাগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
রান্নার গ্যাসের দাম না বাড়ানোর জেরে তেল সংস্থাগুলির লোকসানের অঙ্ক ৬০ হাজার কোটি টাকা ৷ বিপুল এই ক্ষতির বোঝা কেন্দ্রীয় সরকার নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ না পড়ে। বহু দেশই এই পথে হাঁটেনি।
ইরান যুদ্ধের সময় ভারতে তেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
যেখানে পাকিস্তানে বেড়েছে ৫০ শতাংশ।
আমেরিকায় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ
মায়ানমারে বেড়েছে আরও বেশি। প্রায় ৯০ শতাংশ।
এখানেই শেষ নয়। এই সঙ্কট পর্বে ভারত সরকার সাধারণ মানুষের উপর কোনও বিধিনিষেধ চাপায়নি। যেখানে বহু দেশে কার্যত অঘোষিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল।
পাকিস্তানে তেলের অভাবে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয় ৷ বহু অফিসে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করা হয়। নির্দেশ দেওয়া হয়, সপ্তাহে চারদিনের বেশি কোনও সরকারি অফিসও খোলা যাবে না। পাকিস্তান জুড়ে পেট্রোল পাম্পের বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখেছে বিশ্ববাসী ৷ শ্রীলঙ্কায় নির্দেশ দেওয়া হয়, সপ্তাহে গাড়িপিছু সর্বাধিক ১৫ লিটার তেল তোলা যাবে ৷ বাংলাদেশেও জ্বালানির সঙ্কট তৈরি হয়। অশান্তি এড়াতে তেলের ডিপোর বাইরে সেনা নামানো হয়। জ্বালানি সঙ্কটে চাপে পড়ে চিনের মতো বড় অর্থনীতিও। জ্বালানি সংক্রান্ত সমস্ত রফতানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। হু হু করে বাড়ে ডিজেলের দাম ৷
সবার থেকে আলাদা ভারত। সঙ্কট এলেও দেশ সামাল দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ঝড়ের মুখে অবিচল থেকেছে ভারতের গতিশীল শক্তিশালী অর্থনীতি।