নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ক্যাপ্টেন স্মিতকে ইজরায়েলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন:
ফোনে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যথেষ্ট আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘‘আপনি শুধু ভারত বা ইজরায়েলের নন, বরং গোটা বিশ্বের প্রকৃত নায়ক।’’ এর পাশাপাশি নেতানিয়াহু ক্যাপ্টেন স্মিতকে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে তিনি ইজরায়েলের প্রধান ‘মশাল টর্চ’ প্রজ্বলন করবেন। সাধারণত এই সম্মান শুধুমাত্র ইজরায়েলের মহান ব্যক্তিত্বদেরই দেওয়া হয়।
‘পিছন থেকে মাথায় ভারী আঘাত’: ককপিটের সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্ত:
কথোপকথনের সময় ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ক্যাপ্টেন স্মিতকে জিজ্ঞেস করেন, সেদিন ককপিটের ভিতরে ঠিক কীভাবে এই ঘটনা শুরু হয়েছিল? এর জবাবে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা মনে করে প্রতিটি খুঁটিনাটি জানান।
ক্যাপ্টেন স্মিত জানান, কো-পাইলট ককপিটের ভিতরে নামাজ পড়ার অনুরোধ করছিলেন, যা বিমানে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ক্যাপ্টেন স্মিত সম্মান দেখিয়ে নিজের মনোযোগ সামনের দিকে রেখেছিলেন। কিন্তু আচমকাই তাঁর মাথার পিছনের দিকে খুব জোরে এবং ভারী একটি আঘাত করা হয়।
ক্যাপ্টেন স্মিত বলেন, ‘‘প্রথম আঘাতটি যখন হয়েছিল, তখন আমি কিছুই বুঝতে পারিনি এবং মনে হয়েছিল, বিমানে কোনও বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছে অথবা বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। কিন্তু যখন একের পর এক আমার মাথায় একাধিক আঘাত আসতে শুরু করল, তখন বুঝতে পারলাম, সমস্যা বিমানে নয়, বরং ককপিটে আমার সঙ্গে থাকা ওই ব্যক্তির মাথায়।’’
‘চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হাল ছাড়িনি’, কীভাবে খুলেছিলেন ককপিটের দরজা?
পরপর হামলার কারণে ক্যাপ্টেন স্মিতের চোখের সামনে পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে যায় এবং অন্ধকার নেমে আসে। তিনি অনুভব করেন যে বিমানটি অত্যন্ত দ্রুত নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। মাথা থেকে অবিরাম রক্তপাত এবং চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসা সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন স্মিত হাল ছাড়েননি। তিনি জানান, ককপিটের দরজা ভিতর থেকে একটি নব ঘুরিয়েই খোলা সম্ভব ছিল। অন্যদিকে, বাইরে থেকে ক্রু সদস্যরা জরুরি কোডের মাধ্যমে দরজা খোলার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু হামলাকারী সহ-পাইলট বারবার সেই চেষ্টা আটকে দিচ্ছিলেন।
ক্যাপ্টেন স্মিত বলেন, ‘‘আমি ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলাম। বিমানের নীচের দিকে পড়ে যাওয়ার এবং বাইরে মানুষের চিৎকারের ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তখনও আমার ভিতরে শেষ একটুকরো শ্বাস এবং শক্তি বাকি ছিল। আমি নিজেকেই বলেছিলাম, যদি এখনই আমি এই দরজাটি না খুলি, তাহলে আমি এবং এই সমস্ত মানুষ মারা যাব।’’
ক্যাপ্টেন তাঁর অবশিষ্ট সমস্ত শক্তি একত্রিত করলেন। কোনওভাবে মেঝে থেকে উঠে দরজার নব পর্যন্ত হাত পৌঁছে সেটি ঘুরিয়ে খুলে দিলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে সতর্ক অবস্থায় থাকা ক্রু সদস্য এবং যাত্রীরা দ্রুত ককপিটে ঢুকে ওই হামলাকারীকে ধরে ফেলেন।
ক্যাপ্টেনের সাহসিকতার কথা শুনে হতবাক নেতানিয়াহু:
ক্যাপ্টেন স্মিতের এই অভিজ্ঞতার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হতবাক হয়ে যান। তিনি ক্যাপ্টেনের ঠান্ডা মাথা এবং অসম্ভব পরিস্থিতিতে দেখানো সাহসের প্রশংসা করে বলেন, ‘‘আপনার সাহসিকতা অবিশ্বাস্য। এটি সত্যিই ‘টুইস্ট অফ ফেট এবং টুইস্ট অফ ফেইথ।’’ আপনি শুধু শত শত নিরপরাধ মানুষের প্রাণই বাঁচাননি, বরং বিশ্বের সেই বিশ্বাসকেও বাঁচিয়েছেন, যা মনে করে একজন সাহসী পাইলট এবং সাহসী যাত্রী যেকোনও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেন।’’
নেতানিয়াহু ফোনে ক্যাপ্টেন স্মিতের স্ত্রী এবং পরিবারের প্রতিও তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর পক্ষ থেকে অনেক ভালোবাসা ও সম্মান জানান। তিনি বলেন, তাঁরা এখন ইজরায়েলের জাতীয় পরিবারের অংশ।
প্রধানমন্ত্রী মোদি ও ক্যাপ্টেন স্মিতকে স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রণ:
কথোপকথনের সময় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু একটি বড় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘‘ইজরায়েলের আসন্ন স্বাধীনতা দিবসে প্রধান মশাল প্রজ্বলনের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান আমার বন্ধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ক্যাপ্টেন স্মিতকে দেওয়া হবে।’’
নেতানিয়াহু বলেন, ‘‘এই সম্মান সাধারণত ইজরায়েলি নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু এবার ইজরায়েলের প্রতিটি নাগরিক দু’হাত বাড়িয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে। আপনি যা করেছেন, তা কোনও অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম নয়।’’
এর পাশাপাশি ক্যাপ্টেন স্মিত ইজরায়েলের সেই ডেন্টিস্ট চিকিৎসককেও ধন্যবাদ জানান, যিনি হামলার পর তাঁর চিকিৎসা করেছিলেন এবং তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। নেতানিয়াহু হেসে জানান, ওই চিকিৎসকও ক্যাপ্টেনের সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গোটা বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভারতীয় বীরের নাম:
হাজার হাজার ফুট উচ্চতায় নিজের জীবন বাজি রেখে শত শত মানুষের জীবন নিরাপদে মাটিতে ফিরিয়ে আনা ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার আজ শুধু ভারতেরই নয়, ইজরায়েল এবং গোটা বিশ্বের কাছে এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
ককপিটে মৃত্যুকে হার মানানো এই ভারতীয় পাইলটের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব আগামী প্রজন্মের কাছে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে থাকবে। এখন সকলেই সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছেন, যখন ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার একসঙ্গে এই ঐতিহাসিক কূটনৈতিক ও মানবিক সম্পর্কের মশাল প্রজ্বলিত করবেন।
ইজরায়েলের স্বাধীনতা দিবস কবে হয়?
ইজরায়েল প্রতি বছর হিব্রু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তার স্বাধীনতা দিবস (Yom Ha’atzmaut) পালন করে, যা সাধারণত এপ্রিল বা মে মাসে পড়ে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তাই প্রতি বছর এর তারিখ কিছুটা পরিবর্তিত হয়। হিব্রু ক্যালেন্ডারের ‘ইয়ার’ মাসের ৫ তারিখে এই জাতীয় উৎসব গোটা দেশে অত্যন্ত ধুমধাম করে পালন করা হয়।