সরকার ও প্রতিরক্ষা মহলের কর্মকর্তারা এই অভিযানের সাফল্য ও দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে ছয়টি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রথম স্তম্ভ: সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ
কর্তৃপক্ষের মতে, অপারেশন সিন্দুর শুরু থেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়—সন্ত্রাসবাদী ও তাদের মদতদাতাদের নিষ্ক্রিয় করা এবং কোনও বেসামরিক নাগরিকের ক্ষতি না করা।
এই অভিযানকে ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’-এর বিরুদ্ধে একটি হিসেবি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সরকারি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে ৯টি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করা হয়। পাশাপাশি পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলিতেও নির্ভুল হামলা চালানো হয়।
কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, মাত্র ৮৮ ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ্য পূরণ করে ভারত চার দিনের মধ্যেই নিজস্ব শর্তে অভিযান শেষ করে এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির দিকে প্রতিপক্ষকে ঠেলে দেয়।
দ্বিতীয় স্তম্ভ: পাকিস্তানের অভ্যন্তরে গভীর আঘাত
অভিযানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল হামলার গভীরতা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীর জুড়ে ৯টি উচ্চমূল্যের জঙ্গি ঘাঁটিতে সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এই ঘাঁটিগুলি Lashkar-e-Taiba, Jaish-e-Mohammed এবং Hizbul Mujahideen-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে দাবি।
পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের সিয়ালকোট ও বাহাওয়ালপুরের মতো এলাকাতেও হামলা চালানো হয়। পাশাপাশি নূর খান ও সারগোধা বিমানঘাঁটিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
সরকারি সূত্রের দাবি, এই অভিযানে ১০০-র বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে আইসি-৮১৪ অপহরণের সঙ্গে যুক্ত ইউসুফ আজহারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল।
তৃতীয় স্তম্ভ: ‘ওপারে বেশি ক্ষতি, এপারে প্রায় শূন্য প্রভাব’
এই অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি হল ক্ষতির অসমতা।
সরকারি মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের সন্ত্রাস ও সামরিক অবকাঠামোতে বড় আঘাত হানা হলেও ভারতের ভেতরে প্রায় কোনও ক্ষতি হয়নি।
ভারতীয় বায়ুসেনা রাফাল যুদ্ধবিমান, স্ক্যাল্প মিসাইল ও হ্যামার বোমা ব্যবহার করে মাত্র ২৩ মিনিটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশন সম্পন্ন করে বলে জানা গেছে।
১০ মে-র পর অভিযানের পরিধি আরও বাড়িয়ে পাকিস্তানের ১১টি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়। এর মধ্যে ছিল নূর খান, রফিকি, মুরিদ, সুক্কুর, সিয়ালকোট, সারগোধা ও জ্যাকোবাবাদসহ একাধিক এয়ারবেস।
সরকারি দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় পাকিস্তানের বিমান শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে, ভারতের দেশীয় ‘আকাশতীর’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে বলে জানানো হয়েছে।
চতুর্থ স্তম্ভ: যৌথতা, আত্মনির্ভরতা ও দেশীয় প্রযুক্তি
অপারেশন সিন্দুরকে ‘JAI’—Jointness, Aatmanirbharata এবং Indigenisation-এর সফল প্রয়োগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সেনা, নৌ ও বায়ুসেনা একসঙ্গে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে। ২০১৯ সালে চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDS) পদ সৃষ্টির পর এই ধরনের সমন্বয় আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বর্তমানে ৬৫ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম দেশেই তৈরি হচ্ছে।
ব্রহ্মোস, আকাশ, তেজস, স্কাইস্ট্রাইকার ড্রোন ও ডিআরডিও-র অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমসহ একাধিক দেশীয় প্রযুক্তি এই অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে।
পঞ্চম স্তম্ভ: রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নেতৃত্ব
কর্তৃপক্ষের মতে, এই অভিযানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র নেতৃত্বে সেনাবাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়—সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে আঘাত হানা হবে, তবে বেসামরিক নাগরিকদের কোনও ক্ষতি করা যাবে না।
সরকারি সূত্রের দাবি, অতীতে যেখানে কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর বেশি জোর দেওয়া হতো, সেখানে এই অভিযানে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উদ্যোগও চালানো হয়, যাতে ভারতের পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
ষষ্ঠ স্তম্ভ: ‘হোল অব নেশন’ পদ্ধতি
অপারেশন সিন্দুরে শুধু সেনাবাহিনী নয়, বরং গোটা দেশের সমন্বিত অংশগ্রহণ দেখা গেছে বলে দাবি।
বেসরকারি সংস্থা, স্টার্টআপ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও কূটনৈতিক মহল একসঙ্গে কাজ করেছে।
ISRO-এর অন্তত ১০টি উপগ্রহ ২৪ ঘণ্টা নজরদারি সহায়তা দিয়েছে।
একই সঙ্গে ভুয়ো খবর ও প্রচার মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা একযোগে কাজ করেছে এবং নাগরিকদের সচেতন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিদেশে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
উপসংহার
সরকারি মহলের মতে, অপারেশন ‘সিন্দুর’ দেখিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধ শুধু সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব নয়—এটি একটি সমন্বিত জাতীয় প্রয়াস।
এই অভিযান ভবিষ্যতের সংঘাত মোকাবিলায় ভারতের নতুন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি তৈরি করেছে বলেই দাবি করা হচ্ছে।