ভোপাল: নাম পরিবর্তনের পথে ভোপালের বরকতউল্লাহ্ ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়া নাম হবে বাগদেবী ভোজপাল ইউনিভার্সিটি। এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের বৈঠকে সর্বসম্মতিতে নামবদলের প্রস্তাবে সম্মতি মিলেছে। আর সেই নিয়ে নতুন বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে। দেশের ‘প্রথম প্রধানমন্ত্রী’র নামে নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন কী, উঠছে প্রশ্ন। (Maulana Barkatullah Bhopali)
বরকতউল্লাহ্ ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার সমর বাহাদুর সিংহ জানিয়েছেন, এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের কাছে নামবদলের প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন সকলে। এবার প্রস্তাবটি পাঠানো হবে মধ্যপ্রদেশ সরকারের কাছে। সেখান থেকে অনুমতি পাওয়া গেলেই বিজ্ঞপ্তি জারি করে নাম পাল্টে দেওয়া হবে। (Barkatullah University)
কিন্তু নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ছে কেন? জবাব দিতে চাননি রেজিস্ট্রার। তাঁর বক্তব্য, “এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত। আমি শুধু সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছি এবং সেই মতো রাজ্য সরকারকে চিঠি পাঠাব। সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করবে, তার পরই নামবদল হবে। প্রস্তাব পাস হয়েছে। আমার সেই মতো পদক্ষেপ করছি মাত্র।”
বিষয়টি সামনে আসতেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। ১৯৮৮ সালেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হয় বরকতউল্লাহ্ ইউনিভার্সিটি। তার আগে নাম ছিল ভোপাল ইউনিভার্সিটি। স্বাধীনতা সংগ্রামী মৌলানা বরকতউল্লাহ্ ভোপালীর নামে নামকরণ হয়েছিল। তাঁকে ‘ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী’ও বলা হয়। কারণ আফগানিস্তানের কাবুলে নির্বাসিত থাকা অবস্থায়, ১৯১৫ সালে তিনি সেখানে ভারতের প্রথম ‘নির্বাসিত সরকার’ গঠন করেছিলেন। ওই কাজে তাঁর সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ।
আরও পড়ুন: ফাটল চওড়া হচ্ছে বিরোধী জোটে? কংগ্রেসকে কড়া চিঠি দিল CPM, বৈঠকে থাকছে না DMK, তৃণমূল নিজেই ছারখার
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক তথা ভগৎ সিংহ আর্কাইভের সাম্মানিক উপদেষ্টা চমনলাল একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিদেশে বসেই ভারতের স্বাধীনতার জন্য় জীবন উৎসর্গ করেন বরকতউল্লাহ্। জাপান, আমেরিকা, জার্মানি, রাশিয়া, আফগানিস্তান-সহ বহু দেশে যাত্রা করেনতিনি। ভারতের সপক্ষে, ভারতের স্বাধীনতার জন্য সমর্থন জোগাড় করছিলেন তিনি। ১৯২৭ সালে আমেরিকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সেই জন্যই তাঁর কথা সেভাবে জানেন না সকলে। ১৯৮৮ সালে তাঁর জন্মস্থানে, তাঁরই নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করে সম্মান জানানো হয়েছিল। প্রাপ্য সম্মান পাননি উনি।
১৮৫৪ সালের ৭ জুলাই, ভোপালে বরকতউল্লাহ্-র জন্ম বলে জানা যায়। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বম্বে এবং লন্ডনে পড়াশোনা করেন তিনি। লিভারপুলে শিক্ষকতাও করতেন। সেখানেই ভারতীয় বিপ্লবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তাঁর লেখালেখি, বক্তৃতা নিয়ে সেই সময় নড়েচড়ে বসে ব্রিটিশ সরকার। ১৮৯৯ সালে ব্রিটেন ছেড়ে আমেরিকা চলে যান বরকতউল্লাহ্। আমেরিকা থেকে মৌলানা হাসরত মোহানির, যিনি ‘ইনকিলাম জিন্দাবাদ’ স্লোগানের স্রষ্টা, তাঁর সঙ্গে চিঠি আদানপ্রদান চলত। চিঠিতে তাঁর ভাবনা প্রতিফলিত হয়। একটি চিঠিতে লেখেন, ‘২ কোটি মানুষ অনাহারে, ক্ষুধায় প্রাণ হারিয়েছেন। চরম দারিদ্রে পীড়িত ওই মানুষের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম-দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন। ক্ষুধার জন্য একটা গোটা দেশ ধ্বংসের মুখে’। হিন্দু এবং মুসলিম একজোট হয়ে লড়াই করলে, বিভাজনের ফাঁদে পা না দিলে, ইংরেজরা পালানোর পথ পাবে না বলে মনে করতেন তিনি।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে জনস্রোত, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ চায় ককরোচ জনতা পার্টি, আন্দোলনে শামিল সোনম ওয়াংচুকও
১৯১৫ সালে নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেই কাবুলে ‘অস্থায়ী ভারত সরকার’ গড়ে তোলেন বরকতউল্লাহ্। সেই সরকারে শামিল হন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ, মৌলানা উবায়দুল্লাহ্ সিন্ধিও। মহেন্দ্র প্রতাপ ছিলেন রাষ্ট্রপতি। বরকতউল্লাহ্ প্রধানমন্ত্রী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বরকতউল্লাহ্ এবং তাঁর সহযোগীরা জার্মানি পাড়ি দেন। সেখানে জার্মানদের হাতে বন্দি ভারতীয় সৈনিকদের ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করেন তাঁরা। ১৯১৩ সালে লালা হর দয়াল ‘গদক পার্টি’ গড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেন। সেই দলের হয়েও কাজ করেন বরকউল্লাহ্।
১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর কাবুলে ‘অস্থায়ী ভারত সরকার’ গঠিত হয়। সেই প্রথম ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সফল হন ভারতীয়রা। সেখান থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ, সব ধর্ম-ভাষার মানুষকে নিয়ে অভিন্ন ভারত গড়ে তোলার স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হয় বলে জানিয়েছেব আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তথা ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের সম্পাদক আলি নাদিম রেজাভি। পরবর্তীতে হাথরসের রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি গড়ার কাজে হাত দেন, এমনকি জমিও দান করেন।
শুধু তাই নয়, ১০১৯ সালে বরকতউল্লাহ্ সরকারের প্রতিনিধিরা রাশিয়ার মস্কোয় পৌঁছন। সেখানে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধান ভ্লাদিমির লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাঁরা। রাশিয়ায় বিবৃতি দিয়ে বরকতউল্লাহ্ বলেন, “আমি কমিউনিস্ট নই, সোশ্যালিস্টও নই। এশিয়া থেকে ইংরেজদের তাড়ানোই আমার রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞের লক্ষ্য। এশিয়ায় ইউরোপের কায়েম করা পুঁজিপাদের ঘোর বিরোধী আমি। আর সেই পুঁজিবাদের প্রধান প্রতিনিধি ইংরেজরা। এব্যাপারে আমি কমিউনিস্টদের সঙ্গে একমত এবং আমরা স্বাভাবিক মিত্র।”
আমি ইউরোপ কর্তৃক এশিয়ার পুঁজিবাদের এক ঘোর বিরোধী, যার প্রধান প্রতিনিধি হলো ব্রিটিশরা। এ ব্যাপারে আমি কমিউনিস্টদের কাছাকাছি, এবং এই দিক থেকে আমরা এক স্বাভাবিক মিত্র।
সেই প্রথম ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সফল হন ভারতীয়রা। সেখান থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ, সব ধর্ম-ভাষার মানুষকে নিয়ে অভিন্ন ভারত গড়ে তোলার স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হয় বলে জানিয়েছেব আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তথা ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের সম্পাদক আলি নাদিম রেজাভি। পরবর্তীতে হাথরসের রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি গড়ার কাজে হাত দেন, এমনকি জমিও দান করেন। কিন্তু মহেন্দ্রপ্রতাপ এবং তাঁর সহযোগীদের উত্তরাধিকার বজায় থাকলেও, বরকতউল্লাহ্ ক্রমশ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন বলে মত ইতিহাসবিদদের একাংশের।