এই উপলক্ষে স্বাভাবিকভাবেই দুই প্রধানমন্ত্রীর আমলের তুলনা সামনে আসছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নেহরু ও মোদির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য আদর্শগত বা রাজনৈতিক নয়, বরং তাঁরা যে ভারতের শাসনভার সামলেছেন, সেই ভারতের পরিসর ও বাস্তবতা।
৩৪ কোটি থেকে ১৪০ কোটির ভারত
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারতের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ কোটি। দেশ তখন দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, খাদ্যসংকট এবং রাষ্ট্রগঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের পাশাপাশি ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক শক্তি।
প্রধানমন্ত্রীর পদ একই থাকলেও, যে ভারতের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার চরিত্র আমূল বদলে গিয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র
নেহরুর সময় ভারতের গণতন্ত্র ছিল এক নতুন পরীক্ষা, যার সফলতা নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ ছিল। ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রায় ১৭ কোটি ভোটার অংশ নিয়েছিলেন, যাঁদের অধিকাংশই প্রথমবার ভোট দিয়েছিলেন।
বর্তমানে দেশের ভোটার সংখ্যা ৯৫ কোটিরও বেশি, যা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
এখন নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা এবং রিয়েল-টাইম তথ্য বিশ্লেষণ নির্বাচনী লড়াইকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফলে এত বড় গণতন্ত্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জও আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
রাজনীতিতে বেড়েছে প্রতিযোগিতা
স্বাধীনতার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল মাত্র ৫০টির কিছু বেশি রাজনৈতিক দল। তখন জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের আধিপত্য ছিল প্রায় একচ্ছত্র।
বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। শত শত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আঞ্চলিক দলগুলিও বিভিন্ন রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় রাজনীতি এখন আঞ্চলিক স্বার্থ, জোট রাজনীতি, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল গণমাধ্যমের প্রভাব দ্বারা পরিচালিত।
ফলে বর্তমান সময়ের প্রধানমন্ত্রীকে অনেক বেশি জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ সামলাতে হয়।
বদলে গিয়েছে অর্থনীতির চেহারা
নেহরুর সময় ভারতের অর্থনীতি ছিল নবীন ও সীমিত পরিসরের। তখন মূল লক্ষ্য ছিল শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আত্মনির্ভরতা অর্জন।
আজ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ওয়াশিংটন, বেজিং, মস্কো বা ব্রাসেলসে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভারতের মূল্যবৃদ্ধি, বাণিজ্য, জ্বালানির দাম কিংবা বিনিয়োগের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে প্রধানমন্ত্রীকে এখন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখতে হয়।
তাৎক্ষণিক যোগাযোগের যুগ
নেহরুর আমলে সংবাদপত্র ও রেডিও ছিল তথ্যপ্রচারের প্রধান মাধ্যম। সরকারি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে সময় লাগত।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতিটি ভাষণ, ঘোষণা বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ মুহূর্তের মধ্যে টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। জনমতও তৈরি হয় প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে।
ফলে সরকারের কাজকর্মের উপর নজরদারি ও মূল্যায়নও আগের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা
নেহরুর ভারত ছিল সদ্য স্বাধীন একটি দেশ, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছিল। উপনিবেশমুক্ত দেশগুলির মধ্যে ভারতের নৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্ব ছিল বিশেষ।
অন্যদিকে, মোদির নেতৃত্বে ভারত এখন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বৈশ্বিক সংস্থা এবং বিভিন্ন কৌশলগত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক প্রশাসন সংক্রান্ত আলোচনায় ভারতের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।
বেড়েছে মানুষের প্রত্যাশা
১৯৫০-এর দশকের ভারত মূলত খাদ্য, শিক্ষা এবং মৌলিক পরিষেবার চাহিদা পূরণের লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল।
বর্তমান ভারতের নাগরিকরা উন্নত অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, উচ্চ আয়ের সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা, ডিজিটাল সংযোগ এবং বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী ভারতের প্রত্যাশা করেন।
ফলে সরকারের মূল্যায়ন এখন শুধু স্থিতিশীলতা রক্ষার ভিত্তিতে হয় না; উন্নয়ন, দক্ষতা এবং সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেহরু ও মোদি—দুই যুগেরই নিজস্ব চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পর ৩৪ কোটির ভারত থেকে আজ ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে পরিণত হওয়ার যে যাত্রা, তা ভারতের পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
১০ জুন নরেন্দ্র মোদি নতুন ইতিহাস গড়ার পথে এগোচ্ছেন। সেই মুহূর্তে নেহরুর সঙ্গে তুলনা কেবল দুই নেতার নয়, গত সাত দশকে ভারতের অভূতপূর্ব পরিবর্তনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে উঠছে।