ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধের প্রস্তুতিকে নতুন গতি দিতে ভারত তার উচ্চাভিলাষী স্টেলথ মানববিহীন যুদ্ধবিমান (ইউসিএভি) কর্মসূচি ‘ঘাতক’-কে নতুন রূপে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখন এই প্রকল্পটি রিমোটলি পাইলটেড স্ট্রাইক এয়ারক্রাফ্ট (আরপিএসএ) উদ্যোগের আওতায় উন্নয়ন করা হচ্ছে। প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার আনুমানিক ব্যয়যুক্ত এই কর্মসূচি আর শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়, বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অধিগ্রহণ কর্মসূচি হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সফল হলে ভারতীয় বায়ুসেনার আক্রমণ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলে বড় পরিবর্তন আসবে।
SWIFT তৈরি করল ভিত্তি:
এই প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল SWIFT (Stealth Wing Flying Testbed) জেটের মাধ্যমে। SWIFT সফলভাবে ফ্লাইং-উইং স্টেলথ নকশা, স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম এবং অভ্যন্তরীণ অস্ত্র কক্ষ (Internal Weapons Bay)-এর মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই প্রযুক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল বিমানের রাডারে শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কমিয়ে আনা এবং শত্রুপক্ষের অত্যন্ত সুরক্ষিত আকাশসীমার গভীরে প্রবেশ করার সক্ষমতা তৈরি করা।
তবে RPSA শুধুমাত্র এই প্রযুক্তিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রধান লক্ষ্য হল বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন এবং ভারতীয় বায়ুসেনার বর্তমান ও ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমানগুলোর সঙ্গে আরও ভাল সমন্বয় গড়ে তোলা। সেই কারণেই এটিকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ কর্মসূচিগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাফাল-তেজসের থেকেও বেশি বিপজ্জনক?
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ডেভেলপমেন্ট-কাম-প্রডাকশন পার্টনার (DCPP) মডেল গ্রহণ করা। এর মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিকেও প্রকল্পের উন্নয়ন ও উৎপাদনে বড় ভূমিকা দেওয়া হবে। এর ফলে উন্নত কম্পোজিট উপাদান, আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেন্সর প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে বেসরকারি শিল্পের দক্ষতাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এই পদক্ষেপ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযানে নতুন গতি আনবে।
রাফাল এবং তেজসের মতো যুদ্ধবিমান স্টেলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন নয়, অন্যদিকে ‘ঘাতক’ কর্মসূচির আওতায় তৈরি হতে চলা ড্রোনগুলি হবে পরবর্তী প্রজন্মের স্টেলথ প্ল্যাটফর্ম, যেগুলোকে রাডার এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে শনাক্ত বা প্রতিহত করা মোটেও সহজ হবে না।
ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার:
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ঘাতক’-কে এককভাবে যুদ্ধ পরিচালনাকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। এটি এমন সব মিশনে ব্যবহার করা হবে, যেখানে পাইলটচালিত যুদ্ধবিমানের জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এর মধ্যে রয়েছে শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করা (SEAD), কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা চালানো এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ (Electronic Warfare)-এর মতো মিশন।
এর স্বয়ংক্রিয় বা অটোনোমাস ক্ষমতা খুব কম মানবীয় হস্তক্ষেপেই মিশন সম্পন্ন করতে সক্ষম করবে, যার ফলে পাইলটদের নিরাপত্তাও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ঘাতক’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হবে এর ম্যানড-আনম্যানড টিমিং (MUM-T) নীতি। এই ব্যবস্থায় ভারতীয় বায়ুসেনার Su-30MKI এবং ভবিষ্যতের AMCA-র মতো যুদ্ধবিমানগুলো কমান্ড প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, আর তাদের সঙ্গে উড়তে থাকা একাধিক ইউসিএভি (UCAV) সেন্সর, ইলেকট্রনিক ডিকয় বা আক্রমণকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
এর ফলে একটি মাত্র মিশনেই একাধিক টার্গেটের উপর একযোগে অভিযান চালানো সম্ভব হবে এবং শত্রুপক্ষের জন্য প্রকৃত হুমকি চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।