কলকাতা: জল্পনা সত্য়ি করে বিজেপি-তেই যোগ দিলেন তৃণমূলের পদত্যাগী সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়। বৃহস্পতিবার সল্টলেকে বিজেপি-র সদর দফতরে গিয়ে পদ্মপতাকা হাতে তুলে নিলেন তিনি। সেই সঙ্গে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীও করে দিলেন। মমতা এবং তৃণমূল-দুই-ই শেষ বলে দাবি তাঁর। শুধু তাই নয়, বাম এবং তৃণমূল মিলে পশ্চিমবঙ্গকে মরুভূমিতে পরিণত করে ফেলেছিল বলেও মন্তব্য করলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গও ‘বিকশিত ভারতে’র অংশ হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করলেন। (Sukhendu Sekhar Roy Attacks Mamata Banerjee)
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূলে যখন মুষলপর্ব চলছে, সেই সময়ই সাংসদ পদ ছাড়েন সুখেন্দুশেখর। তখন থেকেই তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল, যাতে ইতি ঘটল বৃহস্পতিবার। এদিন সল্টলেকে বিজেপি-র সদর দফতরে পৌঁছে, দলের রাজ্য সভাপতির হাত থেকে পদ্মপতাকা গ্রহণ করেন তিনি। আর তার পরই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন। তৃণমূল সরকারের ‘দুর্নীতি’, ‘অনাচার’, ‘সন্ত্রাসে’র বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। (BJP News)
আরও পড়ুন: রোজ রোজ ইনসুলিন নেওয়া থেকে মুক্তি, সপ্তাহে একবার ব্য়বহারের পেন-ইঞ্জেকশন এল ভারতের বাজারে
২০১১ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে শামিল হওয়া এবং ২০২৬ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি-তে যোগদান নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, “যে সময়ের কথা বলছেন, তা ইত্তেফাক (কাকতালীয়) ছিল, আজও যা হচ্ছে, তা ইত্তেফাক। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাষ্ট্রবাদী জনতা যে পদক্ষেপ করেছিল, তাতেই এই পশ্চিমবঙ্গ ভূখণ্ডে বেঁচে রয়েছি আমরা। নইলে হতো না। অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে আমার মনে এখন আনন্দ। এটা আনন্দের মুহূর্ত।”
এদিন তৃণমূল এবং আগের বাম সরকারকে একযোগে নিশানা করেন সুখেন্দু সরকার। তাঁর বক্তব্য, “আগের সরকারগুলি, বিশেষ করে ৩৪ বছরের বাম সরকার এবং ১৫ বছরের তৃমমূল সরকার মিলে ৪৯ বছরে পশ্চিমবঙ্গকে মরভূমি বানিয়ে গিয়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, যে বাংলা দেশকে শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে দেশকে নেতৃত্ব দিত, সেখানে সব জায়গায় দুর্নীতি, নহি চলেগি, জ্বালিয়ে দেব, পুড়িয়ে দেব…ছোট থেকে এসব শুনতে শুনতে বুড়ো হয়ে গিয়েছি। এই মরুভূমিতে বাংলার মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আমরা কংগ্রেসকে দেখেছি, বামেদের দেখেছি, তৃণমূলকে দেখেছি, বিজেপি-কে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাই এবার জনতা চুপ ছিলেন। তাই কোনও চ্যানেলে সমীক্ষা হয়নি। কারণ মানুষ নীরব ছিলেন, চারিদিকে ছিল নীরবতা। আর নীরবতার ধ্বনি বরাবরই বেশি।”
আরও পড়ুন: ইরানে চবাহার বন্দর গুঁড়িয়ে দিল আমেরিকা, বিপুল পরিমাণ টাকা ঢেলেছিল ভারত
পশ্চিমবঙ্গে যে বিজেপি-র সরকার আসতে চলেছে, তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন বলে জানিয়েছেন সুখেন্দুশেখর। তিনি বলেন, “শমীক ভট্টাচার্য এবং আমার মতো মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে যুক্ত, যাঁরা সেই নীরবতার ধ্বনি শুনতে পান, তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন কী হতে চলেছে। যে জনতা ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টিতে তৃণমূলকে জিতিয়েছিলেন, তাঁরাই চার মাস পর আর জি কর কাণ্ডের জেরে রাস্তায় নেমে আসেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্তও ছিলেন না। গোটা দেশ, প্রবাসী ভারতীয়রাও সপ্তাহান্তে মিছিল করেন। সেটা ছিল আগের সরকারকে মানুষের লাস্ট ওয়ার্নিং, যার চিফ এগজিকিউটিভ সেই দেওয়াললিখন পড়তে পারেননি। শি ইজ ফিনিশড, ওই দল শেষ। এখন বেকার চর্চার দরকার নেই।”
ক্ষমতায় থাকাকালীন বার বার কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তোলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। কেন্দ্রবিরোধী সেই অবস্থানকে সুখেন্দুশেখর ‘কেন্দ্রবিরোধী জিহাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, “কেন্দ্রবিরোধী জিহাদ মেন বসে গিয়েছিল। সেটাই রাজনীতিতে পরিণত হয়েছিল। যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, মহাভারতের বাইরে, ভারতের মানচিত্র থেকে বাংলা বাইরে বলে মনে হচ্ছিল। তিনটি জেনারেশন নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয় বাংলা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে অন্য সব রাজ্য এগিয়ে এলেও, আমরা চুরিতে ব্যস্ত ছিলাম। লুঠেরা, ধর্ষকদের মদত জোগাচ্ছিলাম।”
ভোটারতালিকায় নিবিড় সংশোধন বা SIR-কেও এদিন সমর্থন করেন সুখেন্দুশেখর। তাঁর মতে ১৫০-২০০ আসনে ছাপ্পাভোট হতো। ভোটারতালিকায় জল ছিল। মোদি, অমিত শাহ সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, নির্বাচন কমিশন বাংলার মানুষকে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেন বলে দাবি তাঁর। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে যে নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে, তাতে কোনও বাধা এলে, তা নিয়ে বিশেষ চিন্তার প্রয়োজন নেই বলে মত তাঁর। বাংলার নতুন সরকারকে তিনি ‘মানুষের সরকার’ বলেও উল্লেখ করেন।’
আর জি কর আন্দোলনের নিন্দায় এর আগে সরব হয়েছিলেন সুখেন্দুশেখর। কিন্তু তখনও পদত্যাগ করেননি তিনি। নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয় ঘটতেই কেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন, জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, “প্রমাণ লোপাটে কমিশনার, প্রিন্সিপাল অফ দ্য ইনস্টিটিউশনকে হেফাজতে নিয়ে, গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত ছিল। কারও হিম্মত হয়নি। আমি অসুস্থ ছিলাম। একদিনে দু’বার লালবাজারে ডাকা হয়। আদালতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার আইনজীবী দাদাকে বলা হয় টুইট তুলে নিতে। সেই সময় আমার পোস্ট ৩৩ লক্ষ মানুষ দেখে নিয়েছিলেন। কাজ হয়ে গিয়েছিল আমার। তাই তুলে নিতে বাধা ছিল না। তার পরও তিন-চার মাস লাগাতার ফোনে হুমকি দেওয়া হতো, খুনের হুমকি দিত, মেয়ে-নাতিকে অপহরণের হুমকি আসত। ওই সময়ই পদত্যাগ করতে পারতাম। কিন্তু ভয়ে ছিলাম যে সুপারি কিলার দিয়ে মেরে ফেলতে পারে। বিজেপি-র ৪০০-র বেশি কর্মীকে খুন করেছে। দলের লোকও দলের লোককে খুন করছিল। ভয়, সন্ত্রাস চলছিল। পরিবারের কথা ভেবেই পারিনি।”
রাজ্যসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপি-তে যোগ দিলেন সুখেন্দুশেখর। তাঁর সঙ্গে এদিন বিজেপি-তে যোগ দেন তৃণমূলের অন্য দুই পদত্যাগী সাংসদ, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক। এবার বিজেপি-র টিকিটে তাঁরা রাজ্যসভায় যেতে পারেন বলে জল্পনা শুরু হয়েছে।
Suvendu Adhikari: নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের