ভারত ও রাশিয়া কয়েক দশকের পুরনো কৌশলগত অংশীদার। সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনাকে উপেক্ষা করা যায় না।
অবশ্য, এটাই প্রথম নয় যে রাশিয়া ভারতকে হতাশ করেছে। প্রায় তিন দশক আগেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে মস্কো নয়াদিল্লির সঙ্গে করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, অনেক সময় সবচেয়ে বড় ধাক্কাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
আসলে এখানে ক্রায়োজেনিক (Cryogenic) ইঞ্জিন প্রযুক্তি-র কথাই বলা হচ্ছে। রাশিয়া এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তি ভেঙে দিয়েছিল। এরপরই ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, ভবিষ্যতে আর কোনও দেশের উপর নির্ভর করবে না। সেই সিদ্ধান্তের ফল আজ গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে।
কী ছিল ক্রায়োজেনিক (Cryogenic) ইঞ্জিন চুক্তি?
সময়টা ১৯৯১ সাল। ভারত তার মহাকাশ কর্মসূচিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছিল। পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যাল (PSLV)-এর কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দু’টন বা তার বেশি ওজনের যোগাযোগ উপগ্রহকে পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় জিওস্টেশনারি কক্ষপথে স্থাপন করতে এমন একটি প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল, যা তখন ভারতের হাতে ছিল না। সেই প্রযুক্তিই ছিল ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি।
ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন সাধারণ রকেট ইঞ্জিনের মতো নয়। এতে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষিত তরল হাইড্রোজেন এবং তরল অক্সিজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রকেট উৎক্ষেপণের শেষ ধাপে এই ইঞ্জিনই সর্বাধিক শক্তি সরবরাহ করে। এই প্রযুক্তি ছাড়া ভারী উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো কার্যত অসম্ভব ছিল।
এই প্রয়োজন মেটাতেই ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থা গ্লাভকসমস (Glavkosmos)-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া শুধু কয়েকটি প্রস্তুত ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনই দিত না, বরং এই প্রযুক্তিও সম্পূর্ণভাবে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল।
যদি এই চুক্তি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই ভারত নিজের জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (GSLV) তৈরি করতে সক্ষম হতো। সেই সময় এই চুক্তিকে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
আমেরিকার চাপে কেন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল রাশিয়া?
ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে আমেরিকা। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, রাশিয়া যদি এই প্রযুক্তি ভারতের হাতে তুলে দেয়, তাহলে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, এই প্রযুক্তি হস্তান্তর মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম (MTCR)-এর নিয়ম লঙ্ঘন করবে। যদিও বহু মার্কিন বিজ্ঞানী ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এই যুক্তির সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁদের মতে, ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ব্যবহারিক প্রযুক্তি নয়, কারণ এতে ব্যবহৃত অতিশীতল (Super-cooled) জ্বালানি দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা এবং উৎক্ষেপণের আগে প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
বরং রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চাপ বাড়াতে শুরু করে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে, আর প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন-এর সরকার তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ছিল। পশ্চিমের দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা রাশিয়ার কাছে তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দেয়, যদি রাশিয়া ভারতের সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তি বহাল রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে একাধিক মহাকাশ ও বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে তারা বঞ্চিত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে মস্কো:
অবশেষে রাশিয়া পুরো প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে। পরে কিছু প্রস্তুত ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন সরবরাহের প্রস্তাব দিলেও ভারতের কাছে ইঞ্জিনের চেয়ে প্রযুক্তিই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ইঞ্জিন কেনা সম্ভব হলেও, প্রতিটি উৎক্ষেপণের জন্য অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল থাকতে ভারত রাজি ছিল না। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মতে, এটিই ছিল দেশের মহাকাশ কর্মসূচির অন্যতম বড় কৌশলগত ধাক্কা।
চুক্তি বাতিলের ফলে ভারতের কী ক্ষতি হয়েছিল?
রাশিয়ার এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সময়ের ওপর। জিএসএলভি (GSLV) কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে যায়। পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েকশো কোটি টাকা বেড়ে যায়।
সেই সময় ভারী উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর জন্য ভারতকে ফ্রান্স ও রাশিয়ার উৎক্ষেপণ পরিষেবার উপর নির্ভর করতে হয়েছিল। প্রতিটি উৎক্ষেপণের জন্য বিদেশি সংস্থাগুলিকে বিপুল অর্থ প্রদান করতে হতো।
তবে এই সঙ্কটের মধ্যেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিংহ রাও এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা ভারতের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভারত নিজস্ব ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন নিজেই তৈরি করবে। শুনতে সিদ্ধান্তটি যত সহজ ছিল, বাস্তবে তা কার্যকর করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
দুই দশকের সংগ্রাম, তারপর সাফল্য:
ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন তৈরি করা বিশ্বের সবচেয়ে জটিল প্রকৌশলগত (Engineering) চ্যালেঞ্জগুলির একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে ব্যবহৃত তরল হাইড্রোজেনের তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ২৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এত কম তাপমাত্রায় কাজ করতে সক্ষম টার্বোপাম্প, কম্বাশন চেম্বার এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা যে কোনও দেশের জন্যই অত্যন্ত কঠিন।
ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রায় দুই দশক ধরে একের পর এক ব্যর্থতা, অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবুও তাঁরা হাল ছাড়েননি।
অবশেষে ইসরো (ISRO) নিজস্ব স্বদেশি ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত ও শক্তিশালী হয়েছে। আজ LVM3-এর মতো অত্যাধুনিক রকেট ভারতের সেই আত্মনির্ভরতার সাফল্যেরই প্রতীক।
রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কীভাবে ভারতের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল?
যদি সেই সময় রাশিয়া ভারতকে ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর করত, তাহলে হয়তো ভারত কয়েক বছর আগেই ভারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণ শুরু করতে পারত। কিন্তু সম্ভবত আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারত না।
ক্রায়োজেনিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার ঘটনাই ভারতকে বাধ্য করেছিল নিজস্ব গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের পথে হাঁটতে। আর সেই বাধ্যবাধকতাই পরবর্তীকালে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
আজ ভারত বিশ্বের সেই অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে রয়েছে, যাদের নিজস্ব ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি রয়েছে। এই প্রযুক্তির জোরেই ভারত ভারী যোগাযোগ উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে।
চন্দ্রযান-২, চন্দ্রযান-৩ এবং আদিত্য-এল১ (Aditya-L1)-এর মতো মহাকাশ অভিযানের সাফল্যের পিছনেও এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে ভারত অন্যান্য দেশের উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক আয় করছে এবং বিশ্ব মহাকাশ অর্থনীতিতে (Global Space Economy) নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে।
বিদ্রূপের বিষয় হল, যে প্রযুক্তি ভারতের হাতে পৌঁছানো ঠেকাতে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রাশিয়া পিছিয়ে গিয়েছিল, আজ সেই প্রযুক্তিই ভারতের অন্যতম বৃহত্তম কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হয়েছে।