এই প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের জ্বালানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। অনুমান করা হচ্ছে, বর্তমানে প্রায় ১,৫০০টি জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে রয়েছে, আর আরও কয়েকশো জাহাজ পাশের ওমান উপসাগরে অবস্থান করছে। দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে স্থির হয়ে থাকা এসব জাহাজের গায়ে নানা ধরনের সামুদ্রিক জীব জন্ম নিতে শুরু করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এই জীবগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এখন একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, বাণিজ্য পুনরায় শুরু হলে এসব জাহাজে বেড়ে ওঠা সামুদ্রিক জীব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। Biological Invasions প্রকাশিত এই গবেষণাটি ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (UMCES), উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন (WHOI)-সহ ২৪ জন সামুদ্রিক বিজ্ঞানীর একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল যৌথভাবে পরিচালনা করেছে।
গবেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আরব উপসাগরে কয়েক মাস ধরে নোঙর করে থাকা হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ অজান্তেই সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক (Invasive) প্রজাতির এক বড় ধরনের ‘সুপার-স্প্রেডার’ সঙ্কটের কারণ হয়ে উঠতে পারে। “Closure of the Strait of Hormuz May Trigger a Biotic Invasion Super-Spreader Event” শিরোনামের এই গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় একই স্থানে নোঙর করে থাকার ফলে জাহাজের নীচের অংশে শৈবাল (Algae), বার্নাকল (Barnacles), মাশেল (Mussels) এবং বিভিন্ন ধরনের অমেরুদণ্ডী (Invertebrate) সামুদ্রিক প্রাণীর উপনিবেশ গড়ে ওঠে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হলে এই জীবগুলো বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফাইল ছবি
একটি ‘সুপার-স্প্রেডার’ ঘটনা:
সামুদ্রিক শিল্পে এই ঘটনাকে বায়োফাউলিং (Biofouling) বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় জাহাজের হাল (Hull) এবং প্রপেলার (Propeller)-এর মতো জলে নিমজ্জিত অংশে ধীরে ধীরে বিভিন্ন জীব জমতে শুরু করে। এর সূচনা হয় অণুজীব এবং আঠালো স্তর (Slime) তৈরি হওয়ার মাধ্যমে। এরপর সেখানে শৈবাল, বার্নাকল, ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী এবং খোলস তৈরি করা বিভিন্ন জীব একের পর এক বসতি গড়ে তোলে।
গবেষকরা ১,৫০০-রও বেশি জাহাজের এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানকে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক (Invasive) প্রজাতির বিস্তারের সম্ভাব্য একটি ‘সুপার-স্প্রেডার’ পরিস্থিতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন (WHOI)-এর জীববিজ্ঞানী এবং আক্রমণাত্মক প্রজাতি নিয়ে গবেষণাকারী ক্যারোলিন টেপোল্ট জানান, এই জীবগুলো নতুন পরিবেশের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম।
টেপোল্ট বলেন, “সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলে গুরুতর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে। একবার তারা কোনো নতুন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুললে, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।” তাঁর মতে, বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং উষ্ণ সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতিকে অজান্তেই নতুন নতুন বন্দরে ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশও তৈরি করেছে।
মাথার ওপর ঘনিয়ে আসছে নতুন বিপদ:
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO)-র পরামর্শ অনুযায়ী, ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে অচল অবস্থায় থাকা কোনো জাহাজ যাত্রা শুরু করার আগে বায়োফাউলিং (Biofouling) ব্যবস্থাপনা অবিলম্বে করা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে এই জাহাজগুলো সামুদ্রিক জীবের বৃদ্ধি ও প্রজননের সবচেয়ে সক্রিয় মৌসুমে প্রায় চার মাস ধরে সমুদ্রে আটকে রয়েছে।
IMO-র গবেষণা অনুযায়ী, জাহাজের গায়ে জমে থাকা চিপচিপে শৈবালের (Slime) একটি পাতলা স্তরও গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, বার্নাকল (Barnacles) সামান্য পরিমাণে জমলেও জ্বালানির ব্যবহার এবং কার্বন নির্গমন ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী শিপিং শিল্পে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ১০ শতাংশ কেবলমাত্র বায়োফাউলিংয়ের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত প্রতিরোধ (Drag) কাটিয়ে উঠতেই ব্যয় হয়।
গবেষকরা আরও বলেন, আধুনিক শিপিং শিল্পকে বরাবরই সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক প্রজাতির বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের সতর্কবার্তা, এত বিপুল সংখ্যক জাহাজের এত দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় আটকে থাকার ঘটনা ইতিহাসে নজিরবিহীন। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বায়োফাউলিংয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আক্রমণাত্মক সামুদ্রিক প্রজাতি আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের স্থানীয় প্রজাতিগুলিকে সরিয়ে দিয়ে বিভিন্ন বন্দরের পরিকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
পরিবেশগত প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল ‘এশিয়ান গ্রিন মাশেল’ (Asian Green Mussel), যাকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক (Invasive) সামুদ্রিক প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হওয়া এই মাশেল আরব উপসাগরে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। বর্তমানে এটি ক্যারিবিয়ান সাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরেও ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে স্থানীয় সামুদ্রিক প্রজাতিগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সমাধান ও প্রতিকার:
বিজ্ঞানীদের দল শিপিং অপারেটর, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাতে জাহাজের বায়োফাউলিং (Biofouling) পরিষ্কার করার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হয়।
গবেষণার লেখকদের মতে, জাহাজ যাত্রা শুরু করার আগে জলের নীচেই জাহাজের গা পরিষ্কার করা এই সম্ভাব্য বিপদ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার আগে ডুবুরিদের জাহাজের হাল (Hull) এবং প্রপেলার (Propeller) পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। তবে দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রতিযোগিতার কারণে প্রতি জাহাজ পরিষ্কারের খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ৮,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।