বাবা নবীন কিশোর প্রসাদের মৃত্যুর পরে ২০০৬ সালে নিতিন নবীন প্রথম নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন৷ তৎকালীন পটনা পশ্চিম আসন থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন। আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের পরে তিনি ২০১০, ২০১৫, ২০২০ এবং ২০২৫ সালে একটানা বাঁকীপুরের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিটি নির্বাচনের সঙ্গে আসনটিতে তাঁর প্রভাব ক্রমশ আরও শক্তিশালী হতে থাকে।
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে নিতিন নবীন ৯৮,২৯৯ ভোট পেয়ে আরজেডি প্রার্থীকে ৫১,৯৩৬ ভোটে পরাজিত করেন। প্রায় ৩.৮ লক্ষ ভোটার অধ্যুষিত একটি আসনে এটি একটি বেনজির জয়।
সেদিক থেকে দেখলে, বাঁকীপুর সেই বিরল আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম যেখানে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি, নিতিন নবীনের পরিবারের ঐতিহ্য এবং শহুরে উচ্চবর্ণ ও মধ্যবিত্তের ভোট একীভূত হয়ে একক রাজনৈতিক কাঠামোয় মিশে যায়। নিতিন নবীন রাজ্যসভায় যাওয়ায় আশা করা হয়েছিল উপনির্বাচনে সেই ঐতিহ্যের একটি মসৃণ হস্তান্তর ঘটবে। কিন্তু তা হল না।
প্রশান্ত কিশোর কিন্তু এমনি এমনিই বাঁকীপুরকে ভোটের ময়দান হিসাবে বেছে নেননি। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল জন সুরজ পার্টি একটিও আসন পায়নি৷ শুধু তাই নয়, রাজ্যজুড়ে মাত্র ৩.৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল তারা।
বাঁকীপুর আসনে সেদিক থেকে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল৷ এটি একটি সুসংহত শহুরে নির্বাচনী এলাকা, গণমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি এবং এমন এখানকার ভোটার গোষ্ঠী চিরাচরিত গ্রামীণ জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির চেয়ে শাসন ও নাগরিক বিষয়গুলির প্রতি বেশি আগ্রহী। প্রশান্ত কিশোর তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এই দিকগুলোতেই বেশি জোড় দিয়েছেন৷
কয়েকমাস ধরে প্রশান্ত কিশোর শুধু জাতপাতের ভোট অঙ্কের উপর নির্ভর না করে রাস্তাঘাট, নিকাশি ব্যবস্থা, জল সরবরাহ, যান চলাচল, দূষণ এবং নগর প্রশাসন ভিত্তিক ইস্যু নিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর রাজ্যব্যাপী পদযাত্রার সময় গড়ে তোলা স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এক্ষেত্রে তাঁর এই প্রচারাভিযানে ব্যাপক লাভদায়ক হয়েছিল।
এই উপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী আন্ডারকারেন্ট ছিল নিট (NEET) বিতর্ক এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ।
কোচিং সেন্টার, পরীক্ষার্থী, স্নাতক এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ করা পরিবারে পরিপূর্ণ একটি শহুরে নির্বাচনী এলাকায় এই প্রতিবাদগুলো জনমানসে প্রভাব ফেলেছিল। বিষয়টি শুধুমাত্র একটা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা নিয়োগে বিলম্ব, স্বচ্ছতা এবং বিহারের যুবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বৃহত্তর হতাশাকে প্রতিফলিত করছিল।
প্রশান্ত কিশোর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে আগে এই ক্ষোভের জায়গাটি আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি ছাত্র বিক্ষোভকে শাসনের ব্যর্থতা এবং প্রজন্মগত ক্লান্তির এক বৃহত্তর আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত করতে সমর্থ হন। শুধু জাতপাতের ভিত্তিতে লড়াই না করে, তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, বিহারের তরুণ ভোটাররা সেই চিরাচরিত, একই রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু রাখতে আদৌ চায় কি না।
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে নিরুত্তাপ ছিল এবং বেশ কয়েকটি বুথে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে, কম ভোটার উপস্থিতির উপনির্বাচনগুলোয় প্রায়শই নিষ্ক্রিয় সমর্থনের ব্যাপকতার চেয়ে, যাঁরা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য মাথায় রেখে ভোট দেন তাঁদেরই গুরুত্ব বাড়ায়। এক্ষেত্রে, মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৩৪.২৪ শতাংশ।
বছরের পর বছর ধরে বিরোধীরা কিশোরকে একজন “ইউটিউব রাজনীতিবিদ” এবং এমন একজন পরামর্শক হিসেবে উপহাস করত, যিনি অন্যদের জন্য নির্বাচনে জিতিয়েছেন কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল না।
তাঁর জবাব ছিল বাঁকীপুর। তিনি অলিগলিতে অলিগলিতে প্রচার চালিয়েছিলেন, রাস্তাঘাট, যানজট, জলাবদ্ধতা ও দূষণের মতো বিষয়গুলিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং তাঁর রাজ্যব্যাপী পদযাত্রার সময় তৈরি হওয়া স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্কের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছিলেন। এই বৈপরীত্যটি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হয়ে ওঠে৷ বিজেপি ছিল একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির প্রতীক; প্রশান্ত কিশোর নিজেকে সেই শক্তির সদর দফতরে তারই বিরুদ্ধে লড়তে আসা একজন চ্যালেঞ্জার হিসেবে তুলে ধরেন।
জন সুরাজের জন্য বাঁকীপুর শুধু একটি আসন নয়, এটি প্রমাণ যে দলটি পরিচিতিকে ভোটে রূপান্তরিত করতে পারে। প্রশান্ত কিশোরের জন্য, এটি সেই মুহূর্ত যা তাঁকে একজন রাজনৈতিক কৌশলী থেকে একজন নির্বাচিত রাজনীতিবিদে পরিণত করল।
আর বিজেপির জন্য এই প্রতীকী তাৎপর্য অনস্বীকার্য: ভেঙে গেল নবীন পরিবারের কয়েক দশক ধরে গড়া দুর্গ।