বিহারের ভূমিপুত্র। রাষ্ট্রপুঞ্জে কর্মরত। অপুষ্টি নিয়ে কাজ করেছেন। সেই সূত্রেই পরিচয়। কিন্তু প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি নরেন্দ্র মোদি। তাঁর হাত ধরেই রাজনীতিতে কৌশল রচনার কাজ শুরু প্রশান্ত কিশোরের। তবে সেই জীবন এখন অতীত। ভোটকুশলীর পেশা থেকে সরে এসেছিলেন আগেই। এবার নিজে ভোটে লড়ে বিজেপি-কে ধরাশায়ী করলেন তিনি। বিহার বিধানসভায় মানুষের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যাবে তাঁকে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছিল প্রশান্তর দল ‘জন সুরাজ পার্টি’। একটি আসনেই জয়ী হতে পারেনি তারা। বরং প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। সেই পরাজয়ের দায় বর্তেছিল তাঁরই ঘাড়ে। অন্যদের ভোটের ময়দানে এগিয়ে দিলেও, নিজে কেন সরাসরি লড়াইয়ে গেলেন না, ওঠে প্রশ্ন। সেই আবহেই মাস খানেক আগে ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রশান্ত। যে সে আসন নয়, উপনির্বাচনে বিজেপি-র দুর্গ বাঁকীপুর থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা করেন।

সেই সময়ও জয় নিয়ে তেমন আত্মবিশ্বাস শোনা যায়নি প্রশান্তর গলায়। বরং মানুষের বিচারবুদ্ধি নিয়েই কার্যত প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, “বিজেপি যদি বাঁকীপুরে জেতে, তাহলে মেনে নেব বিহারের মানুষ ওদের রাজনীতিতে বিশ্বাসী, ওদের নেতাদের পছন্দ করেন, ওদের সরকারে আস্থা রাখেন। বিজেপি হারলে ওদের সরকারকে বুঝতে হবে যে, বিহারবাসী ওদের আচরণ, চরিত্র, ভাবমূর্তি এবং শাসন-কিছুই পছন্দ করছেন না।”

বাঁকীপুরের হাত ধরেই নির্বাচনী রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে প্রশান্তর। তাঁর যুক্তি ছিল, বাঁকীপুরে মূলত বিত্তশালী, শিক্ষিত মানুষের বাস। একজন শিক্ষিত প্রার্থী সম্পর্কে ওই সব মানুষ কী ভাবেন, তা জানতে আগ্রহী তিনি। তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও ধারণা আরও স্পষ্ট হবে।

যদিও বাঁকীপুরে প্রশান্তর জয় নিয়ে সন্দিহান ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। কারণ বাঁকীপুর আসনটি বিজেপি-র দুর্গ হিসেবেই পরিচিত। দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিজেপি-র দখলে ওই আসন। বিজেপি-র সর্বভারতীয় সভাপতি হয়ে রাজ্যসভায় যাওয়ার আগে ওই আসন থেকেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন নিতিন নবীন।

কিন্তু সোমবার গণনা শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই ফলাফল সম্পর্কে ধারণা মিলতে শুরু করে। গণনায় প্রথম থেকেই এগিয়ে ছিলেন প্রশান্ত। দিনের শেষে যখন ফলাফল প্রকাশিত হয়, দেখা যায়, ৬৪১৫১ ভোট পেয়েছেন প্রশান্ত। ১৯ হাজার ৩২৪ ভোটে হারিয়েছেন বিজেপি-র নীরজ কুমারকে।

এদিন জয়ের ইঙ্গিত পেয়েই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন প্রশান্ত। তিনি বলেন, “বাঁকীপুরের মানুষের জয় এটা। আমি নির্বাচনী প্রচারের সময়ই বলেছিলাম, এটা বিধায়ক নির্বাচনের ভোট নয়। বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বার্তা দেওয়ার ভোট এটা, যাতে কোনও ভাল মানুষকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী করা হয়।” বিধানসভায় তিনি কী ভূমিকা পালন করেন, তা সময়ই বলবে।

তবে প্রশান্তর এই জয়ে একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হল বলে মনে করছেন রাজনীতিক বিশ্লেষকরা। কারণ ভোটে না লড়েও ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন প্রশান্ত। বিজেপি, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, সংযুক্ত জনতা পার্টি, DMK, তৃণমূলের মতো দলের নির্বাচনী রণকৌশল রচনা করতেন তিনিই। রাজনৈতিক দলগুলির জয়ে এতদিন নেপথ্য ভূমিকায় ছিলেন। তবে আর নেপথ্যে নয়, এবার তিনি একেবারে সম্মুখসমরে।

২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয়বারের জন্য তৃণমূলকে জেতানোর নেপথ্য কারিগরও ছিলেন প্রশান্ত। তৃণমূলের হাত ধরে তাঁর রাজনৈতিক অভিষেকের কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু তখনই প্রশান্ত জানিয়ে দেন, ভোটকুশলীর কাজ থেকে সরতে চান তিনি। নিজের জন্মভূমি বিহারের জন্য কিছু করতে চান। সেই মতোই ২০২২ সালে I-PAC থেকে সরে আসেন এবং ‘জন সুরাজ পার্টি’র সূচনা করেন। পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখেন গোটা বিহার।

প্রথমেই নিজে রাজনীতিতে নেমে পড়েননি। এগিয়ে দিয়েছিলেন অন্যদের। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকেই নামতে হল। শুধু নামলেনই না, প্রথমবারেই বাজিমাত করলেন। বাঁকীপুর যেমন বিত্তশালী, শিক্ষিত মানুষের জায়গা হিসেবে পরিচিত, তেমনই অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। বানিয়া, যাদব, মুসলিম ভোটারের সংখ্যা যথেষ্ট। তাঁদের জন্য প্রশান্ত কী করেন, তা সময়ই বলবে।
Published at : 03 Aug 2026 07:45 PM (IST)