এখনও পর্যন্ত সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী। কিন্তু ইরানের এই বার্তার অর্থ, ভবিষ্যতে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় জলসীমার বাইরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক সহযোগীদের পরিকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—যদিও ইরান ঠিক কোন নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে, তা প্রকাশ করেনি।
ইরানের এমন বার্তার মধ্যেই আমেরিকার পক্ষ থেকেও নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ভ্রমণ নির্দেশিকায় ইরানকে ‘Do Not Travel’ তালিকায় রাখা হয়েছে এবং ইরানে থাকা মার্কিন নাগরিকদের অবিলম্বে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভারত মহাসাগরকে ঘিরে উদ্বেগের অন্যতম কারণ দিয়েগো গার্সিয়া। মার্চে ইরান এই ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত দ্বীপের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা সামনে এসেছিল। মার্কিন সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের SM-3 ইন্টারসেপ্টর দিয়ে ভূপাতিত করার কথা জানানো হয়েছিল। তবে কোনও ক্ষেপণাস্ত্রই দ্বীপে আঘাত করেনি।
দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন সামরিক সুবিধা রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের দিকে ইরানের দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
এদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর USS George Washington বর্তমানে আরব সাগরে রয়েছে। USNI News-এর ২১ সেপ্টেম্বরের ফ্লিট ট্র্যাকার অনুযায়ী, ক্যারিয়ারটি Carrier Air Wing 5 এবং USS Shoup-সহ ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযানে যুক্ত রয়েছে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট মার্কিন জাহাজ ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্য—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা হয়নি। যুদ্ধক্ষেত্রে জাহাজের সঠিক অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে।
IRGC মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি দাবি করেছেন, ইরানের হাতে এমন কিছু নতুন সামরিক সক্ষমতা রয়েছে যা এখনও যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। তিনি বলেন, নতুন করে হামলা হলে সেই অস্ত্র ও সক্ষমতা ব্যবহার করা হতে পারে। তবে ইরানের এই দাবিগুলির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তাই ইরানের হাতে ঠিক কত পাল্লার বা কত গতির নতুন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—এ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ইরান-আমেরিকা সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষও নতুন করে তীব্র হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর হুথিরা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে।
রিয়াধে হামলার পাশাপাশি ইয়ানবু, তাইফ, বিশ ও ফারাসানেও হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে সৌদি পক্ষ জানিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, রিয়াদের কাছে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা গেলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে বিভিন্ন দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল পরিকাঠামো এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ—তিনটিই আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালীও এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইয়েমেনে হুথি-সৌদি সংঘাত বাড়লে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু স্থলভাগ বা একটি নির্দিষ্ট সমুদ্রপথে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১৭ সেপ্টেম্বর আমেরিকা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি-সহ একটি সীমিত ইরানি প্রতিনিধিদলকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় যোগ দেওয়ার অনুমতি দেয়।
পেজেশকিয়ান ২২ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার কাছে ইরান নত হবে না বলে জানান এবং আলোচনার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
অর্থাৎ একদিকে যুদ্ধের ময়দানে ‘জিওগ্রাফি অব ওয়ার’ বদলের হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে কূটনীতির বার্তা—দুই সমান্তরাল পথেই এগোচ্ছে তেহরান।
ইরানের হুঁশিয়ারির পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সংঘাত ফের তীব্র হলে কি তা পারস্য উপসাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত অঞ্চলে পৌঁছবে?
ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ইয়েমেনের হুথি হামলা ইতিমধ্যেই সৌদি আরবের রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছেছে। একইসঙ্গে হরমুজ ও বাব-এল-মানদেব—দুই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়েই বাড়ছে উদ্বেগ।
তবে ইরান ঠিক কোন নতুন অস্ত্র বা কোন নতুন লক্ষ্যবস্তু ব্যবহার করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে আপাতত ‘যুদ্ধের ভূগোল বদলানোর’ হুমকি একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সতর্কবার্তা হিসেবেই সামনে রয়েছে।