বুধবার জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়া চিনা প্রেসিডেন্টকে এভাবেই বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা নিঃসন্দেহেই বিরল৷
মেরিল্যান্ড, রাজধানী ওয়াশিংটনের ঠিক বাইরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শি জিনপিংয়ের বিমান অবতরণের পর রানওয়েতে গিয়ে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী পেং লিইউয়ানকে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। লম্বা কোট ও গ্লাভস পরা ট্রাম্প এবং শি এরপর পাশাপাশি দাঁড়ান বিমানবন্দরের রানওয়েতে। সেই সময় সামরিক ব্যান্ডে বাজতে থাকে সংগীত। দুই রাষ্ট্রনেতার মাথার উপর দিয়ে তখন উড়ে যাচ্ছে B-1 স্টেলথ বোমারু বিমান৷
বিমানবন্দরে ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মে মাসে ট্রাম্প চিন সফরে গেলে তাঁকে একই ধরনের অভ্যর্থনা দেওয়া হয়নি। এবার শি-র সফর ঘিরে তিন দিন ধরে একাধিক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে হবে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। তার আগেও থাকছে আরও একটি সামরিক বিমান প্রদর্শন।
বিমানবন্দরের রানওয়েতে ছ’টি F-22 যুদ্ধবিমান এবং ছ’টি F-16 যুদ্ধবিমান সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছিল। চিনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে যেন আক্ষরিক অর্থেই ‘লাল গালিচা’ পেতে দিয়েছিল আমেরিকা।
এয়ার চায়নার বিমানটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে এসে থামার পর, যেখানে এয়ার ফোর্স ওয়ানও রাখা হয়, তাঁকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে যান ট্রাম্প।
পোপের সফর বাদ দিলে, অ্যান্ড্রুজে এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অভ্যর্থনার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানকে প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির এবং ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভকে প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের স্বাগত জানানোর ঘটনা উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি আমেরিকা ও চিন যখন বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনা সামলানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ই ট্রাম্প-শি বৈঠক হতে চলেছে।
দুই রাষ্ট্রপ্রধানের আলোচনায় শুল্ক, বিরল মাটির খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেলস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি উত্তেজনা যাতে আরও না বাড়ে, সেই লক্ষ্যেও দুই পক্ষ আলোচনা করতে পারে।
আমেরিকা ও চিনের মধ্যে চলা বাণিজ্যিক সাময়িক সমঝোতার মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ফলে সেই সমঝোতা আরও বাড়ানো যায় কি না, তা আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
রেয়ার আর্থ সরবরাহ নিয়েও বেজিংয়ের উপর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তি রফতানির ক্ষেত্রে আমেরিকার আরোপ করা বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চিন।
এর পাশাপাশি তাইওয়ান এবং ইরানের সঙ্গে চিনের সম্পর্কও দুই নেতার আলোচনায় উঠে আসতে পারে। ফলে বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি অত্যন্ত স্পর্শকাতর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ও আলোচনার টেবিলে থাকবে।
শি জিনপিংয়ের তিন দিনের মার্কিন সফরে রয়েছে একাধিক আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। থাকবে আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন। এই ন্যাশনাল আর্কাইভসেই সংরক্ষিত রয়েছে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং সংবিধানের মূল নথি।
রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি সংস্থার কর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা। আমেরিকার বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির শীর্ষ আধিকারিকরাও সেখানে থাকতে পারেন।
তবে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা ও কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালেও ট্রাম্প-শি বৈঠকে রয়েছে একাধিক মতপার্থক্য। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান এবং ইরান—সবকটি বিষয়েই দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
তাই বৈঠকে দুই পক্ষ এমন কিছু ক্ষেত্রে সীমিত সমঝোতার জায়গা খুঁজতে পারে, যেখানে চুক্তি বা বোঝাপড়া সম্ভব। একইসঙ্গে বৃহত্তর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলিতে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হতে পারে এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।