২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাষ্ট্রসঙ্ঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের সামনে দুটো অপশন রয়েছে—চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি Islamic Republic-কে দ্রুত ‘annihilate’ করা হবে। ট্রাম্প আরও বলেন, আমেরিকার মিডটার্ম ইলেকশনের পরে নাকি ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে এবং তাঁর দাবি, ইরানের জন্য সেই চুক্তিতে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে কোনওভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। হোয়াইট হাউসও তাঁর রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভাষণের সারাংশে ইরানকে নিয়ে একই অবস্থান তুলে ধরেছে।
অর্থাৎ, যে মঞ্চের অন্যতম লক্ষ্য আন্তর্জাতিক সংঘাতকে আলোচনার পথে নিয়ে আসা, সেই মঞ্চেই একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার সম্ভাবনার কথা উঠল। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে আমেরিকার বিরুদ্ধে পাল্টা বক্তব্য রাখেন। ট্রাম্প যে ইরানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ হিসাবে বিশ্বসমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে চলেছে, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইরান জানাচ্ছে, তারা তো বিগত ২০০ বছরে কোনও দেশের উপরে হামলাই চালায়নি, উল্টে তাঁরাই সন্ত্রাসের শিকার৷ এই দাবি তুলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে যুদ্ধের সময় নিহত ইরানি শিশুদের ছবি প্রদর্শন করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্যে আমেরিকার হামলার কারণে ইরানে প্রাণহানি ও ধ্বংসের বিষয়টি উঠে আসে।
ফলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে ইরান ইস্যুতে দুই বিপরীত বয়ান স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ও পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগ, অন্যদিকে তেহরানের যুদ্ধ ও অসামরিক প্রাণহানি।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভাষণে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ঘটনাকেও নিজের বিদেশনীতি ও মার্কিন শক্তির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপের পর দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে একটি বড় তেল-চুক্তি হয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ওই চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল প্রমাণিত তেল-সম্পদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
ট্রাম্প রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে বলেন, “To the victor belong the spoils”—অর্থাৎ বিজয়ীর কাছেই যুদ্ধের লাভ বা লুটের মাল যায়—এমন একটি ঐতিহাসিক ধারণার উল্লেখ করেন।
এবারের সাধারণ সভার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর এক বছরের মেয়াদ শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এর আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভার পাশাপাশি নিউইয়র্কে কাশ্মীর ইস্যুতেও বৈঠক করে OIC-এর Ministerial Contact Group। ২১ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে আজারবাইজান, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও নাইজারের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। OIC-এর সরকারি বিবৃতিতে কাশ্মীরের মানুষের অধিকারের পক্ষে অবস্থান জানানো হয়েছে।
পাকিস্তান ও তুরস্কও কাশ্মীর নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভার মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য OIC-এর এই অবস্থানের বিরোধিতা করা হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং OIC-এর এই বিষয়ে মন্তব্য করার কোনও এখতিয়ার নেই।
এই পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে—একদিকে ইরান নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের সরাসরি সংঘাত, অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলির একটি গোষ্ঠীর কাশ্মীর নিয়ে সক্রিয়তা। OIC-এর Contact Group যেখানে কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলছে, সেখানে ইরান নিয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। OIC-এর সরকারি বিবৃতিতে অবশ্য তাদের কাশ্মীর-সংক্রান্ত অবস্থানই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশনের ফাঁকে ভারতকে ঘিরেও ট্রাম্পের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্যে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য এবং রুশ তেল কেনা নিয়ে মার্কিন চাপের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলোচনায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে বড় প্রশ্ন—নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায় এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা যায়।
মহাভারতের পাশাখেলার সভায় ক্ষমতাবানদের নীরবতা নিয়ে যে নৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সেই উপমা টেনেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভাকে ‘ধৃতরাষ্ট্রসঙ্ঘ’ বলা যায় কি না—এমন প্রশ্ন উঠছে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষণে।
তবে বাস্তব কূটনীতির ছবিটি আরও জটিল। রাষ্ট্রসঙ্ঘ একই মঞ্চে ট্রাম্পের ইরান-বিষয়ক কঠোর বক্তব্য, পেজেশকিয়ানের পাল্টা বক্তব্য, OIC-এর কাশ্মীর নিয়ে অবস্থান এবং ভারতের প্রত্যাখ্যান—সবকিছুরই জায়গা দিয়েছে। ফলে নিউইয়র্কের এই সাধারণ সভা শুধু বক্তৃতার মঞ্চ নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক শক্তির টানাপোড়েনেরও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা: ইরান থেকে কাশ্মীর, ভেনেজুয়েলার তেল থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক—২০২৬-এর UNGA-তে একাধিক সংঘাত ও কূটনৈতিক সমীকরণ একই মঞ্চে এসে মিশেছে। প্রশ্নটা তাই শুধু রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভূমিকা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হল, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনা, চাপ, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য কোথায় দাঁড়াবে।