Last Updated:
ক্রিস্টা না মরে আমেরিকার এক প্রদেশের আইনি প্রক্রিয়াটাই এলোমেলো করে দিয়েছেন।
প্রদীপ চক্রবর্তী, কলকাতা: ফাঁসির আদেশে কী লেখা হয় জানেন? ‘Hanged by neck until death’। মানে গলায় ফাঁস দিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঝোলানো হবে। যাতে নির্দেশের ফাঁক গলে কেউ বেঁচে যেতে না পারেন। ব্রিটিশ আমলে নাকি নিয়মের ফাঁক দিয়েই এক বিপ্লবীকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন এক স্বদেশী উকিল। ফাঁসির আদেশে শুধু ঝোলানোর নির্দেশ লেখা ছিল। গলায় ফাঁস দিয়ে ঝোলাবে নাকি পায়ে ফাঁস দিয়ে? কতক্ষণ ঝোলাতে হবে? এসব লেখা ছিল না। তাই ঝোলানো মাত্র নির্দেশ কার্যকর হয়েছে বলে ওই উকিল নিজের মক্কেলকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
এই গল্প মুখে মুখে প্রচলিত। কোথাও লেখা নেই। কিন্তু, আমেরিকার টেনেসি প্রদেশে যা হয়েছে তা তো গল্পকথা নয়। একেবারে বাস্তবে ঘটেছে। সেপ্টেম্বরের তিরিশ তারিখ আগেই ঘটেছে। মার্কিন মুলুকে ঘটেছে। এবং তাতে আমেরিকা তো বটেই গোটা বিশ্বের মানুষ চমকে গিয়েছে। ক্রিস্টা গেল পিকে। খুনের আসামি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ ছিল। বিষ ইঞ্জেকশন শরীরে পুশ করা হল। একটা নয়। দু দুটো। কিন্তু, ক্রিস্টা মরলেন না। এখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসাধীন। আর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর করা তো ব্যর্থ হয়েছে। এর পর ক্রিস্টার কী হবে? আলোচনা শুরু হয়েছে ট্রাম্পের দেশে। তার আগে ক্রিস্টার গল্পটা ছোট্ট করে জেনে নিই।
১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে সহপাঠীকে খুন করে ক্রিস্টা৷ সহপাঠী তার প্রেমিক চুরির চেষ্টা করছে, সন্দেহ ছিল ক্রিস্টার৷ ১৯৯৬ সালে ক্রিস্টাকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেয় আদালত৷ সবচেয়ে কমবয়সি মহিলা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড পায় ক্রিস্টা৷ ১৯৭৬-র পর ১৯-তম মহিলা হিসেবে ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ড হত টেনেসিতে শেষ মহিলার মৃত্যুদণ্ড হয় ২০৬ বছর আগে৷
১৯৯৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পাওয়ার পর থেকে জেলবন্দি ক্রিস্টা। জেলে তাঁকে নিভৃত কারাবাসে রাখা হয়েছে। কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। জেলবন্দি অবস্থাতেই ক্রিস্টার আইনজীবীরা আইনের বিভিন্নস্তরে আবেদন জানিয়েছেন। সব জায়গাতেই ক্রিস্টার প্রাণরক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়েছে। ২০০১ সালে সে এক সহ বন্দিকে হত্যারও চেষ্টা করেছিল। জুতোর ফিতে দিয়ে এক বৃদ্ধা বন্দিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে চেয়েছিলেন ক্রিস্টা। এত কাণ্ডের পর ৩০ সেপ্টেম্বর ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ডের দিন ধার্য হয়। ক্রিক্টাকে দু দুবার বিষের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়।
প্রথমবার জেল আধিকারিকদের ক্রিস্টা জানান, তার হাতে জ্বালা করছে। তবে অচেতন হয়ে পড়ার কোনও লক্ষণ ক্রিস্টা দেখাননি। দ্বিতীয় ইঞ্জেকশন পুশ করতে ক্রিস্টা জ্ঞান হারান। কিন্তু, সকলের সামনেই নাক ডেকে ঘুমোতে শুরু করেন তিনি। অচেতন ক্রিস্টাকে তৃতীয়বার ইঞ্জেকশন দেওয়া যায়নি। সেটা বিধির বিরুদ্ধে হত। তবে ক্রিস্টার জ্ঞান আর ফেরেনি। তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি হাসপাতালে ভর্তি। তাঁকে ক্রিটিকাল কন্ডিশনে রাখা হয়েছে। একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিতে গিয়ে কোমায় পাঠিয়ে দেওয়া? এটা কিন্তু, জেল প্রশাসনকেই কাঠগড়ায় তুলছে। কারণ আদালত প্রাণদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল। জীবন্মৃত করে বাঁচিয়ে রাখার নয়। বিষের ইঞ্জেকশনেও কি ভেজাল রয়েছে নাকি? তাও আমেরিকায়? ক্রিস্টা না মরায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। টেনেসি প্রদেশের গভর্নর নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। টেনেসি প্রদেশে আর যত প্রাণদণ্ড কার্যকর করার ছিল, সব স্থগিত রাখার আছে।
রাশিয়ার কিংবদন্তি বলে, সে দেশের এক ধর্মগুরু রাশপুতিনকে নাকি বেশ কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করেছিল জারেরা। কিন্তু, কেকে সায়নাইড বিষ মিশিয়েও রাশপুতিনকে হত্যা করা যায়নি। তারপর বুকে বারবার গুলি করে, হাত-পা বেঁধে তাঁরে হিমশীতল নদীতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। রাশপুতিনের মতো ক্রিস্টার কি কোনও অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে? যে তিনি বেঁচে গেলেন। বাংলায় অবশ্য আমরা রাশপুতিন বুঝি না। আমরা বুঝি সেই আপ্তবাক্য। রাখে হরি, মারে কে?
