Last Updated:
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে সে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুধু একটা নির্দিষ্ট জায়গায় হয়নি। গোটা ফ্রান্স জুড়ে হয়েছে। তার মানে এই বিক্ষোভকে কেউ পরিচালনা করেছে। যা নিয়ে কোনও গোয়েন্দা তথ্য ফ্রান্সের সরকারের কাছে ছিল না।
প্রদীপ চক্রবর্ত্তী, কলকাতা: ১৪ জুলাই, ১৭৮৯। গণবিপ্লব কী? বিশ্বকে শিখিয়েছিল ফ্রান্স। ওই দিন বাস্তিল দুর্গের পতন হয়েছিল। ২ অক্টোবর ২০২৬। পরবর্তী প্রজন্মের বিক্ষোভ কেমন হবে? তার একটা ডেমো বা নমুনা পেশ করল ফ্রান্স।
অন্য দেশগুলি যখন জেন-জির মন বোঝার চেষ্টা করছে? ফ্রান্সে জেন আলফারা রাস্তায় নেমে গেল। শুধু রাস্তায় নামাই নয়। ফ্রান্সকে একেবারে তোলপাড় করে দিয়েছে ফ্রান্সেরই বালক-কিশোররা। ফ্রান্স জুড়ে মাধ্যমিক স্তরের স্কুল পড়ুয়ারা তাণ্ডব চালিয়েছে। ফ্রান্সে তিন হাজার সাতশোটি মাধ্যমিক স্তরের স্কুল রয়েছে। তার মধ্যে পাঁচশোটি স্কুলে এমন ভাঙচুর হয়েছে যে সেগুলি আর খোলার অবস্থায় নেই। শহরে শহরে আগুন জ্বলেছে। দোকান-বাজারে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। সম্পত্তি নষ্ট ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দুহাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে ফ্রান্স জুড়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু, ছাত্রদের এমন ক্ষেপে উঠতে দেখে ফ্রান্স সরকারই থই খুঁজে পাচ্ছে না। ড্যামেজ কন্ট্রোল কোন পথে করা হবে, তার এখনও উপায় খুঁজে বের করা যায়নি। ছাত্রদের দাবি কী? সেটা স্পষ্ট নয়। ছাত্ররা রেগে আছে কেন? সেটা তারা জানিয়েছে।
সিলেবাস লম্বা, সময় কম এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই৷ ক্লাসগুলিতে অতিরিক্ত পড়ুয়া, ৩০ থেকে ৪০ জন৷ স্কুলগুলির পরিকাঠামো ও খাবার নিম্নমানের৷ তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকাঠামো স্কুলে নেই৷ কলেজে ভর্তির অনলাইন পদ্ধতিতে বৈষম্য রয়েছে৷
সমস্যাগুলি চেনা এবং অচেনাও। আমাদের রাজ্যেও স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, পরিকাঠামোর সমস্যা এবং মিড ডে মিল নিয়ে গত জমানায় অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকার সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমাদের দেশে একটি ক্লাসে চল্লিশজন ছাত্র থাকাকে অতিরিক্ত ধরা হয় না। বরং স্বাভাবিকের থেকে কম ধরা হয়। এবারের গরমে ইউরোপে তাপপ্রবাহ হয়েছে। রাস্তার পিচও গলে গিয়েছিল। চাষাবাদের ক্ষতি হয়েছে। এবং স্কুল কলেজে পড়ুয়ারা কষ্ট পেয়েছে। তাই তারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে।
ফ্রান্সের ছাত্র সংগঠনগুলি দেশজুড়ে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ জারি রাখার কথাও জানিয়ে দিয়েছে। সে তো ফ্রান্সের ঘরোয়া সমস্যা। তবে বিক্ষোভকারীদের একটা অভিযোগ, ভবিষ্যতে ইউরোপে একটা বড় গোলমালের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কী সেটা? ক্লাসে অতিরিক্ত পড়ুয়া। ফ্রান্সের জন্মহার কম। ক্লাসে অতিরিক্ত পড়ুয়া এল কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ইতালিতে সরকারের সাম্প্রতিক এক পদক্ষেপে। ইতালির সরকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ কতজন বিদেশি পড়ুয়া থাকতে পারবে। তার মানে বিদেশিদের জন্যেই ক্লাসগুলিতে পড়ুয়ার চাপ বাড়ছে। বিদেশি কারা? পরিয়াযীরা।
সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের জন্যে ইউরোপ উদারতা দেখিয়ে দরজা খুলে গিয়েছিল। এখন শরণার্থীদের জন্যে ইউরোপের সমাজবিন্যাস বদলে গিয়েছে। দেশগুলিকে অতি ডানপন্থীরা মাথা তুলছে। তারা মানুষকে বোঝাচ্ছেন শরণার্থীদের জন্যেই তোমাদের পাতে খাবার কম পড়ছে। স্কুলে তোমাদের বাচ্চাদের সঠিকভাবে সময় দেওয়া যাচ্ছে না। তোমাদের করের টাকায় পরিষেবা ভোগ করছে শরণার্থীরা। তার মানে ইতালির মতোই ফ্রান্সেও ভবিষ্যতে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হবে? স্কুল পড়ুয়াদের বিক্ষোভ কি তারই একটা ইঙ্গিত দিয়ে রাখল? কারণ, অতিরিক্ত পড়ুয়া তো শরণার্থীদের কারণেই হয়েছে। তার মানে নদী যেমন সাগরে মেশে? এই বিক্ষোভের নদীগুলিই ভবিষ্যতে গিয়ে একটা মহা বিপ্লবের সাগরে পড়তে চলেছে? লক্ষণ কিন্তু ভাল নয়।
