ফ্লাইদুবাই বিমানের ককপিটে তাঁর ওমানি সহ-পাইলট হামলা চালানোর সময় প্রথমে স্মিত ভেবেছিলেন, বিমানটিতে কোনও বড়সড় যান্ত্রিক সমস্যা বা ক্ষতি হয়েছে। পরে বুঝতে পারেন, পাশে বসে থাকা সহ-পাইলটই তাঁকে একের পর এক আঘাত করছেন। তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করে নেতানিয়াহু তাঁকে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইজরায়েলের পরবর্তী স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক মশাল জ্বালানোর আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।
কথোপকথনের শুরুতেই স্মিতের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী৷ নেতানিয়াহুকে স্মিত জানান, তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন৷ এরপর নেতানিয়াহু তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে জানতে চান, ঠিক কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল।
মাচ্ছর জানান, বিমানের সহ-পাইলট প্রার্থনা করার জন্য নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। স্থানীয় অনেক ক্রু সদস্যের ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক বিষয় হওয়ায় তিনি সম্মান দেখিয়ে পিছনে না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তিনি বলেন, “এটি একটি স্বাভাবিক ফ্লাইট ছিল। সহ-পাইলট প্রার্থনা করতে চেয়েছিলেন, যা অনেক স্থানীয় মানুষই করেন। তিনি যখন প্রার্থনা করছিলেন, সম্মান দেখিয়ে আমি পিছনে না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।”
এর প্রায় চার-পাঁচ মিনিট পর আচমকাই মাথার পিছনে প্রচণ্ড আঘাত অনুভব করেন মাচ্ছর। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, বিমানে কোনও কিছুর ধাক্কা লেগেছে বা বিমানটির কোনও ক্ষতি হয়েছে।
মাচ্ছর বলেন, “প্রায় চার-পাঁচ মিনিট পর আমার প্রথম মনে হয়েছিল, বিমানে কোনও ক্ষতি হয়েছে, কিছু একটা ঠিক নেই।”
কিন্তু পরপর আঘাত আসতে থাকায় তিনি বুঝতে পারেন আসল ঘটনা।
“এরপর একের পর এক আঘাত আসতে থাকে। তখনই বুঝতে পারি, এটা বিমান নয়, আমার সঙ্গে ককপিটে থাকা অন্য লোকটিই আমাকে আঘাত করছে।”
সহ-পাইলটকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন মাচ্ছর। কিন্তু প্রথম কয়েকটি আঘাতেই তাঁর অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি বলেন, “আমি ওকে থামানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু প্রথম দিকের আঘাতের কারণে আমার দৃষ্টি প্রায় চলে গিয়েছিল। সবকিছু একেবারে ঝাপসা দেখছিলাম।”
এরপরই তিনি বুঝতে পারেন, বিমানটি তীব্র গতিতে নীচের দিকে নামছে। মাচ্ছর বলেন, “সেই মুহূর্তে আমার পরের চিন্তা ছিল, বিমানটি প্রচণ্ডভাবে নীচের দিকে নামছে।” তাঁর স্মৃতিতে সেই সময়ের ঘটনাগুলি এখনও সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। তিনি বলেন, “আমার স্মৃতি এখনও রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে ঘটনাগুলি টুকরো টুকরোভাবে মনে পড়ছে। ওই সময়ের কথা এটুকুই মনে আছে।”
মাচ্ছর জানান, তিনি একবার ককপিটের দরজা খোলার চেষ্টা করে সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু সহ-পাইলট আবার সেটি বন্ধ করে দেন।
তিনি বলেন, “আমি একবার দরজা খুলতে পেরেছিলাম। কিন্তু মনে হয়, ও আবার সেটি বন্ধ করে দিয়েছিল।” এরপর ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলেন মাচ্ছর। বাইরে থেকে বিমানের কেবিনের যাত্রীদের চিৎকার এবং বিমানের দ্রুত নীচে নামার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, “এই সময় আমার মনে আছে, আমি ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলাম। বিমানের শব্দ এবং মানুষের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম।” তখনই বুঝতে পারেন, তাঁর সামনে শেষ একটি সুযোগ রয়েছে।
মাচ্ছর বলেন, “রাষ্ট্রদূতকে যেমন বলছিলাম, তখন আমার মধ্যে শেষবারের মতো লড়াই করার শক্তিটুকু বাকি ছিল। সেটা নিজের জন্য হোক বা অন্যদের জন্য—কিন্তু আমি জানতাম, যদি আমি এটা না করি, তাহলে আমি মারা যাব।”
“তখন আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাই এবং সেটি খুলে দিই।” দরজা খোলার পর বাইরে বেশ কয়েকজন অপেক্ষা করছিলেন বলেও জানান তিনি। মাচ্ছর বলেন, “ভাগ্যক্রমে, বাইরে মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরা দ্রুত ভিতরে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। তারপরের ঘটনাটা আপনারা জানেন।”
মাচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা নেতানিয়াহুর
কঠিন পরিস্থিতিতে মাচ্ছরের সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, “অসম্ভব পরিস্থিতিতে আপনার সাহস এবং ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় আমি সত্যিই অভিভূত।”
এরপর নেতানিয়াহু জানতে চান, কীভাবে মাচ্ছর ককপিটের দরজা খুলেছিলেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, “আপনি কীভাবে ককপিটের দরজা খুললেন? দরজা খোলার জন্য যে পিন থাকে, সেটি কি আপনি টেনেছিলেন?”
মাচ্ছর স্পষ্ট করে জানান, দরজা খোলার জন্য কোনও পিন টানতে হয়নি। ককপিটের দরজায় একটি টার্ন-টু-ওপেন ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, “বাইরের দিক থেকে দরজা শুধুমাত্র একটি কোডের মাধ্যমে খোলা সম্ভব ছিল। বাইরে থাকা আমার সহকর্মীরা কোড দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি তাঁদের কোড দিতে দিচ্ছিল না।”
“ভিতর থেকে দরজা খোলার একমাত্র উপায় ছিল নবটির কাছে পৌঁছনো। সেটি খুব দ্রুত ঘোরানো যায়। আমি যখন হাত দিয়ে নবটি ধরতে পেরেছিলাম, তখন সেটি ঘুরিয়ে দরজা খুলে দিই।”
এরপর শব্দের খেলা করে নেতানিয়াহু বলেন, “ভাগ্যের এক মোড় এবং বিশ্বাসের এক মোড়।”
ককপিটের দরজা খোলার পর কী ঘটেছিল, ইজরায়েলি যাত্রীদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন বলেও জানান নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, “আপনি যা করেছেন, তা অসাধারণ। এরপর কী ঘটেছিল, তা অবশ্যই ইজরায়েলি যাত্রীদের কাছ থেকে শুনেছি। আপনি একজন মহান নায়ক। আপনার সঙ্গে আরও কয়েকজন নায়ক ছিলেন এবং আপনারা পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। আপনি বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।”
নেতানিয়াহুর কথায়, মাচ্ছর শুধু মানুষের প্রাণই বাঁচাননি, গোটা বিশ্বের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, আপনি আরও বড় কিছু বাঁচিয়েছেন। আপনি বিশ্বের সেই বিশ্বাসকে বাঁচিয়েছেন যে সাহসী একজন পাইলট এবং সাহসী যাত্রীরা একসঙ্গে এই অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করতে পারেন, যতই তা ভয়ঙ্কর বা হিংস্র হোক।” মাচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা গোটা বিশ্বে হয়েছে বলেও জানান নেতানিয়াহু। “আপনাকে যথার্থভাবেই গোটা বিশ্বে প্রশংসা করা হচ্ছে। আপনি ইজরায়েলের নায়ক, ভারতের নায়ক, গোটা বিশ্বের নায়ক,” বলেন তিনি।
ঘটনার পর মাচ্ছরের চিকিৎসা করা ইজরায়েলি দন্ত চিকিৎসকের কথাও উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, “এখানকার মানুষ আপনাকে দু’হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাবেন। সেই দন্ত চিকিৎসকও, যিনি আপনার চিকিৎসা করেছিলেন।”
নেতানিয়াহু জানান, ওই চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁর কথাও হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কখনও এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন কি না। তিনি বলেছিলেন, আপনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। সত্যি বলতে, ঘটনাটি অলৌকিকের কাছাকাছি।” মাচ্ছর জানান, তিনি ওই চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে চান।
তিনি বলেন, “আমিও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। সত্যি বলতে, তিনিই আমার জীবন বাঁচিয়েছেন।” জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, “আপনারা দু’জন মিলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।” এরপর মাচ্ছরের স্ত্রীকেও শুভেচ্ছা জানাতে বলেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, “আমার এবং আমার স্ত্রীর তরফ থেকে আপনার স্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাবেন। আমি জানি আপনার পরিবার রয়েছে। মনে রাখবেন, আপনি আমাদের পরিবারেরই একজন। আমরাও সেই পরিবারের অংশ এবং বীরদের পরিবারও বটে।”