সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে গ্রেফতার থাকা হামাম আল-হাম্মামি নাকি তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তিনি ককপিটের ভিতরে ক্যাপ্টেন মচ্ছারকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, এরপর স্বাভাবিকভাবে বিমান চালিয়ে যাওয়ার এবং প্রয়োজনীয় অবতরণের ছাড়পত্র নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কোনও ভবন বা বিমানের সঙ্গে বিমানটিকে ক্র্যাশ করার পরিকল্পনা ছিল বলে ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম Ynet-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-হাম্মামি নাকি বিমানটি জর্ডানের আকাশসীমার উপর পৌঁছনো পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন এবং তারপর হামলা চালান। তিনি তদন্তকারীদের নাকি জানিয়েছেন, এই সময়টি বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল যাতে বিমানটি ইজরায়েলে পৌঁছনোর আগে কর্তৃপক্ষের কাছে ষড়যন্ত্রটি শনাক্ত করা বা তা আটকানোর জন্য খুব কম সময় থাকে।
তিনি আরও নাকি বলেছিলেন, যদি তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছতে না পারেন, তাহলে বিমানটি তেল আভিভের কোনও বহুতল ভবন অথবা জর্ডানে অবস্থিত কোনও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ভেঙে ফেলবেন।
অন্য একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যে, ইজরায়েলি চ্যানেল ১৩-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পাইলটের চাকরির জন্য আল-হাম্মামি বিশেষভাবে ফ্লাইদুবাইকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ এই বিমান সংস্থা তেল আভিভে বিমান পরিষেবা পরিচালনা করত। দ্য টাইমস অফ ইজরায়েল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি নাকি তদন্তকারীদের বলেছিলেন, “কোন বিমান সংস্থা তেল আভিভে যায়, তা আমি খুঁজে দেখেছিলাম। সেই কারণেই ফ্লাইদুবাইকে বেছে নিয়েছিলাম। আমাকে নিয়োগ করার আগেই আমি এর পরিকল্পনা করেছিলাম।”
রিপোর্টগুলি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই ষড়যন্ত্রটি ৩০ সেপ্টেম্বরের বিমানযাত্রার সময় তৈরি হয়নি; বরং হামাম আল-হাম্মামি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগেই এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
হামলার আগের কয়েক মাসে তিনি বেশ কয়েকবার বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে যাতায়াত করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, জুন মাসে ইজরায়েল সফরের সময় তিনি ওই সফরকে তথ্য সংগ্রহ এবং পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার কাজে ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-হাম্মামি প্রাথমিকভাবে জুলাই মাসে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা বাতিল করেন, কারণ ততদিনে ক্রু সদস্যদের একজনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল।
কীভাবে বানচাল হল ষড়যন্ত্র:
তবে ক্যাপ্টেন মচ্ছার প্রাথমিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর এবং গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হওয়ায় পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়।
রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রার্থনা করার কথা বলে মচ্ছারের কাছে যাওয়ার পর আল-হাম্মামি ককপিটের ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে ভারতীয় ক্যাপ্টেনের উপর হামলা চালান। এরপর মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এর ফলে যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকে ফেলতে সক্ষম হন। পরে ছুটিতে থাকা দুই পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সাহায্য করেন। এরপর বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে।
হামলার সময় আল-হাম্মামি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার পর বিমানটি এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় ১৬,০০০ ফুট নীচে নেমে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। ইতালীয় সংবাদপত্র Corriere della Sera জানিয়েছে, তিনি ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং রাডার সামনে ঠেলে দিয়েছিলেন, যার ফলে বিমানটি দ্রুত নীচের দিকে নামতে শুরু করে। পরে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে হামলার বিবরণ দেন মচ্ছার। তিনি জানান, তাঁকে আঘাত করার কিছুক্ষণ আগে আল-হাম্মামি প্রার্থনা করার কথা বলেছিলেন। প্রথমে ক্যাপ্টেন ভেবেছিলেন, বিমানটিতেই কোনও আঘাত লেগেছে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, আঘাতগুলি আসলে কো-পাইলটের কাছ থেকেই আসছে।
পাইলটের যাচাই নিয়ে প্রশ্ন:
সাম্প্রতিক এই তথ্যগুলি যাত্রিবাহী বিমান চালানোর জন্য আল-হাম্মামি কীভাবে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন, বিশেষ করে ইজরায়েলগামী রুটে, তা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২৯ বছর বয়সী আল-হাম্মামিকে এর আগে ওমানে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তিনি এর আগে ওমান এয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে অন্যত্র চাকরির জন্য আবেদন করার সময় এই সম্পর্কিত তথ্য কীভাবে দেখানো হয়েছিল, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।
এই ঘটনায় ওমান, UAE এবং ইজরায়েলের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পর বিদেশি অসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন নেতানিয়াহু। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তাও ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।