ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েনের আবহে এমনই এক তুলনা সামনে এসেছে। অভিযোগ, বাংলাদেশে চাল, ডাল, তেল, নুন থেকে শুরু করে জ্বালানি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে নির্ভরশীলতা রয়েছে। এমনকি জ্বালানি সংকটের সময় হাসিনা সরকারের আমলে তৈরি ভারত-বাংলাদেশ পাইপলাইন দিয়েও বাংলাদেশ তুলনামূলক সস্তায় ডিজেল পেয়েছে। বর্ষাকালে গুজরাত থেকেও বিপুল পরিমাণ ইলিশ বাংলাদেশে গিয়েছে। অথচ তারপরেও ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে নানা সময়ে সমালোচনার সুর শোনা যায়।
কিন্তু একই যুক্তি যদি তুরস্কের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে ছবিটা কী দাঁড়ায়?
২০২৩ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়েছিল তুরস্ক। সেই সময় ভারত ‘অপারেশন দোস্ত’ শুরু করে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে অংশ নেয়। ভারতীয় উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় তুরস্কের অবস্থান নিয়ে নয়াদিল্লির অস্বস্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় পাকিস্তানের পাশে তুরস্কের দাঁড়ানোর অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ ওঠে, পাকিস্তানকে ড্রোন ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে তুরস্ক। তুরস্কের ড্রোন বিশেষজ্ঞদের পাকিস্তানে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ভারতের দাবি ছিল, পাকিস্তানের দিকে আসা একাধিক ড্রোনকে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশ ভূমিকম্পের সময় ভারতের সাহায্য পেয়েছিল, সেই দেশই কেন ভারতের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াল?
শুধু সামরিক সহযোগিতাই নয়, কাশ্মীর ইস্যুতেও তুরস্কের অবস্থান ভারতকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এর্দোগান একাধিকবার কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলেছেন। পাশাপাশি ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা OIC-এর মঞ্চেও কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ফলে ভারতের একাংশের প্রশ্ন—বাংলাদেশ যদি ভারতের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার পর ভারতকে সমালোচনা করে বলে ‘অকৃতজ্ঞ’ হয়, তাহলে তুরস্কের ক্ষেত্রেও কি একই প্রশ্ন উঠবে না?
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে জ্বালানির ক্ষেত্রে। ভারতকে সমালোচনা করলেও তুরস্ক ভারতীয় জ্বালানি আমদানি করছে। বরং সাম্প্রতিক সময়ে সেই আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
এর পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বড় অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, পাশাপাশি ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কিছু তেল শোধনাগারের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ডিজেল সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে তুরস্ক বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে ভারতের দিকে ঝুঁকেছে।
দাবি করা হচ্ছে, আগে রাশিয়া থেকে তুরস্কের দৈনিক ডিজেল আমদানি ছিল প্রায় ২ লক্ষ ব্যারেল। ইউক্রেনীয় হামলার ধাক্কায় তা কমে প্রায় ৮০ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। বিপরীতে আগস্টে ভারত থেকে তুরস্কের ডিজেল আমদানি দৈনিক প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছছে।
অর্থাৎ, ভারতীয় পরিশোধিত জ্বালানির গুরুত্ব আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা বেড়েছে, সেই ছবিটাই সামনে আসছে।
ভারতকে দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য পশ্চিমা দেশগুলির সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। অভিযোগ—রাশিয়ার তেল কেনার মাধ্যমে ভারত নাকি ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও বারবার ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু একই সময়ে তুরস্কও রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করেছে। তুরস্কের নিজস্ব হিসেব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশই রাশিয়া থেকে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এখানেই প্রশ্ন—ভারত রাশিয়ার তেল কিনলেই যদি তা যুদ্ধের অর্থ জোগানোর কারণ হয়, তাহলে ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের বিপুল রুশ জ্বালানি আমদানিকে একইভাবে দেখা হবে না কেন?
ভারতের ‘রিফাইনিং পাওয়ার’ই এখন বড় শক্তি
ভারতের আরেকটি বড় সুবিধা হল তার পরিশোধন ক্ষমতা। ভারত নিজের প্রয়োজনের সিংহভাগ অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আমদানি করলেও দেশের তেল শোধন পরিকাঠামো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী।
বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল থেকে বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরি করার ক্ষমতা ভারতের রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা যখন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও হামলার কারণে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে, তখন ভারতীয় রিফাইনারিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এখানেই আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে। রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে আমেরিকা যে কড়া শুল্কনীতির কথা বলেছে, তার প্রভাব যদি ভারতীয় পরিশোধিত জ্বালানির উপরও পড়ে, তাহলে সমস্যায় পড়বে শুধু ভারত নয়—তুরস্কের মতো ন্যাটো সদস্য দেশও।
কারণ, তুরস্ক নিজেই রাশিয়ার জ্বালানির উপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় ডিজেলের অন্যতম ক্রেতাও তুরস্ক।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কি সবার জন্য একই মাপকাঠি প্রয়োগ হচ্ছে?
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘অকৃতজ্ঞতা’র অভিযোগ উঠতেই পারে। আবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন আসতে পারে—ভারত যখন বাণিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশকে জ্বালানি দেয়, তখন বাংলাদেশ কেন তার সমালোচনা করতে পারবে না?
কিন্তু একই যুক্তি তুরস্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভারতের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা করা, কাশ্মীর প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তোলা—সবকিছুর পরেও যখন তুরস্ক ভারতের কাছ থেকেই বিপুল পরিমাণ ডিজেল কিনছে, তখন প্রশ্ন উঠবেই।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব বা শত্রুতা যতটা আবেগের বিষয়, তার চেয়েও বেশি স্বার্থের হিসেব। ভারতও সেই হিসেবেই তেল রফতানি করে—কারণ তাতে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ভারত যদি রাশিয়ার তেল কিনে ‘দোষী’ হয়, তাহলে রাশিয়ার জ্বালানির উপর নির্ভরশীল ন্যাটোর দেশগুলির জন্য আলাদা মাপকাঠি কেন?
সরষের মধ্যেই যদি ভূত থাকে, তাহলে সেই ভূতদের তালিকায় তুরস্কের নামও কি থাকবে? আর সেই তালিকা কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে রয়েছে? নাকি ভূতের রাজ্যে তিনিই হয়ে উঠেছেন ব্রহ্মদৈত্য?