ভারতের বিরুদ্ধে মামলা লড়তেই পাকিস্তানের বাজেটের অর্ধেক টাকা নষ্ট!
পাকিস্তানের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটের নথি থেকে যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা ইসলামাবাদের শাসকদের নীতি ও অগ্রাধিকারের স্বরূপ প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।
পাকিস্তানের ‘ওয়াটার রিসোর্সেস ডিভিশন’-এর বাজেটের নথি অনুযায়ী, ওই বিভাগের প্রায় ৪.২৪ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপির বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ২.১৮ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি শুধুমাত্র ‘পাকিস্তান মিশন ফর ইন্ডাস ওয়াটার্স’-এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, যে দেশে প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যা হয় এবং জলের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ এক ফোঁটা জলের জন্যও হাহাকার করেন, সেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ১২ লক্ষ ডলার। অর্থাৎ, নিজেদের দেশের মানুষকে বন্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, তার ছয় গুণেরও বেশি টাকা ভারতের বিরুদ্ধে দ্য হেগের আদালতে মামলা লড়তে খরচ করা হচ্ছে।
ভারতের ভাগের বিলও নিজেরাই মেটাচ্ছে পাকিস্তান!
এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের কিশনগঙ্গা এবং রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলির বিরুদ্ধে দ্য হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালতে আপত্তি জানিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু এই কাহিনিতে সবচেয়ে বড় মোড় হল, ভারত এই আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রমকে স্বীকৃতিই দেয় না এবং কখনও এই প্রক্রিয়ায় অংশও নেয়নি। আদালত যখন ভারতের কাছে মামলার খরচের অংশ চেয়েছিল, তখন ভারত সরাসরি তা দিতে অস্বীকার করে।
এর পরেও দমে যায়নি পাকিস্তান। মামলা দীর্ঘায়িত করার জন্য তারা নিজেরাই প্রায় ৫০ কোটি টাকা আদালতে জমা দিয়েছে, যার মধ্যে ভারতের ভাগের ফিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের কার্যক্রমের জন্যও পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ১৯.৪ লক্ষ ডলার খরচ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ভারত যখন এই আদালতকেই স্বীকৃতি দেয় না, তখন পাকিস্তানের একা পুরো বিল মিটিয়ে এই মামলা টেনে নিয়ে যাওয়া আসলে নিজেদের দেশের জনগণের চোখে ধুলো দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
লন্ডনের দামি আইনজীবীদের পোয়াবারো, ঘণ্টার হিসাবে খরচ হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা:
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে মামলা লড়ার জন্য পাকিস্তান লন্ডনের সবচেয়ে দামি ও প্রথম সারির আইনজীবী সংস্থা, যেমন Twenty Essex এবং 3 Verulam Buildings-এর বিপুল পারিশ্রমিক নেওয়া ব্যারিস্টার ও প্রযুক্তিগত উপদেষ্টাদের একটি বিশাল দল নিয়োগ করেছে।
পাকিস্তানের বাজেটে এই আইনজীবীদের পারিশ্রমিকের কোনও পৃথক হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে ব্রিটিশ আদালতগুলির ২০২৬ সালের রেট কার্ড অনুযায়ী, মধ্য লন্ডনের একজন সিনিয়র আইনজীবীর পারিশ্রমিক ঘণ্টায় প্রায় ৬৫,০০০ টাকা। কোনও বড় মামলায় আইনজীবী সংস্থার পার্টনারের পারিশ্রমিক ঘণ্টায় ১ লক্ষ টাকারও বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, একজন সিনিয়র কিংস কাউন্সেলের (KC) ব্রিফ ফি-ই প্রায় ১.৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ২০১৬ সালের অগাস্ট থেকে চলা এই মামলায় পাকিস্তান এখনও পর্যন্ত নিজেদের আইনজীবী এবং তাঁদের পাঁচতারা আতিথেয়তার পিছনে কত বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি খরচ করেছে, তার কোনও হিসাব দেশের জনগণকে দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তানে ‘তেল-জলের’ সঙ্কট, সরকারি আধিকারিকদের পায়ে হেঁটে চলতে হচ্ছে… অথচ আইনজীবীদের বিলাসিতা!
পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি ১৭ সেপ্টেম্বর দেশে নতুন সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপের ঘোষণা করেছিল।
– সরকারি গাড়ির জ্বালানি (পেট্রোল/ডিজেল) বরাদ্দ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
– সরকারি দফতরে নতুন গাড়ি ও সরঞ্জাম কেনার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
– মন্ত্রী ও আধিকারিকদের বিদেশ সফর এবং সরকারি ভোজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
– উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট করা হয়েছে।
একদিকে সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে, দেশের স্বার্থে ‘ত্যাগ’ স্বীকার করুন, চা খাওয়া কমান, বিদ্যুৎ ও পেট্রোল বাঁচান। অন্যদিকে, দ্য হেগে আইনজীবীদের পকেট ভরানোর জন্য সরকারি কোষাগারের দরজা পুরোপুরি খুলে রাখা হয়েছে।
নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে ‘ভারত’-কে হাতিয়ার করছে পাকিস্তান:
পাকিস্তানে আজ জলের সঙ্কট ভারতের কারণে নয়, বরং তাদের নিজেদের দুর্বল জল ব্যবস্থাপনার কারণে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাকিস্তানের চারটি বৃহত্তম বাঁধ—টারবেলা, মঙ্গলা, চশমা এবং ওয়ারসাকের জল সঞ্চয়ের ক্ষমতা ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছে।
দ্য হেগে কোটি কোটি ডলার খরচ করার এই গোটা নাটক শুধুমাত্র এই কারণে সাজানো হচ্ছে, যাতে পাকিস্তান সরকার নিজেদের জনগণকে বোঝাতে পারে যে, ‘দেশে জলের অভাব ভারতের কারণে হচ্ছে, আমাদের ব্যর্থতার জন্য নয়!’
নিজেদেরই পাতা ফাঁদে আটকে ইসলামাবাদ:
২০২৫ সালে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারত যখন সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করে দিয়েছিল, তখন থেকেই ভারত যে কোনও সালিশি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
তা সত্ত্বেও পাকিস্তান এমন একটি আদালতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করছে, যার রায়ের আর কোনও গুরুত্বই অবশিষ্ট নেই। ২০২৬ সালের ৩১ অগাস্ট আদালত একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, মামলার খরচ কে বহন করবে, সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত রায়ের সময় নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, তত দিন পর্যন্ত পাকিস্তানের এই অপ্রয়োজনীয় খরচ একইভাবে চলতে থাকবে এবং আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের টাকা এভাবেই সমুদ্রে ভেসে যেতে থাকবে!