মঙ্গলবারের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারের শেষ মুহূর্তে ফক্স নিউজের সঞ্চালক শন হ্যানিটির (Sean Hannity) সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি শুধু সকলের কাছে অনুরোধ করছি, আপনারা এমনটা ভাবুন যেন আমিই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি।” রিপাবলিকানরা খারাপ ফল করলে তাঁর আইন প্রণয়নের কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি বিপদের মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে টিপস, অতিরিক্ত কাজের সময়ের পারিশ্রমিক এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি সংক্রান্ত করছাড়ের বিষয়গুলি তুলে ধরে ভোটারদের সতর্ক করেন ট্রাম্প। নির্বাচনের ফলাফলকে হালকাভাবে না নেওয়ারও আবেদন জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, “আমাদের সমর্থকরা যদি ভোট দেন, তাহলে আমরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হব।”
অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের পক্ষে সওয়াল ট্রাম্পের:
সাক্ষাৎকারে ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর পক্ষেও সওয়াল করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, এই অভিযানের ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা যা করেছি, তা অসাধারণ।” তাঁর দাবি, ইরান তাদের সামরিক, নৌ এবং আকাশপথে যুদ্ধ করার সক্ষমতা হারিয়েছে।
তিনি বলেন, “তাদের সামরিক বাহিনী শেষ, নৌবাহিনী শেষ, বায়ুসেনা শেষ, এমনকী এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থাও শেষ।”
আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আসছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, মোট ২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আমেরিকায় আসছে। বিভিন্ন সংস্থা গাড়ি এবং ওষুধ তৈরির কারখানা গড়ে তুলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আমেরিকার মাটিতে ওষুধ উৎপাদন ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর প্রশাসনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ওষুধের জন্য চিনের উপর আমেরিকার নির্ভরতা কমানো হবে। পাশাপাশি, দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ওষুধ আমদানির উপর শুল্কের হার ভবিষ্যতে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অগ্নিপরীক্ষা:
ট্রাম্পের এই আবেদন এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট—উভয় কক্ষেই নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির উপর গণভোট হিসেবেই দেখছেন অনেকে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, মুদ্রাস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক অভিযান নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের মোট ৪৩৫টি আসন এবং সেনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। পাশাপাশি ৩৬টি রাজ্যের গভর্নর পদেও ভোটগ্রহণ হচ্ছে। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের নেট তিনটি আসন বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন চারটি আসন।
হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে রিপাবলিকানরা পরাজিত হলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সরকারি উচ্চপদে নিয়োগ এবং বিচারপতি পদে মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সমস্যা বাড়তে পারে।
রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের করছাড় এবং অভিবাসন নীতির পক্ষে সওয়াল করেছে। তাদের দাবি, এই নীতিগুলি আমেরিকার পরিবারগুলির জন্য লাভজনক হবে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের বামপন্থী উগ্রপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে তারা।
প্রচারের শেষ দিনে জনসভায় ট্রাম্প:
তবে সোমবার নির্বাচনী প্রচারের শেষ জনসভায় ট্রাম্পের বক্তব্যে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় অর্থনৈতিক উদ্বেগ বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। ভাষণে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলার আগে ওয়াশিংটনের রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন।
ভাষণের প্রায় ২৬ মিনিটের মাথায় ট্রাম্প বলেন, “মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের এটাই শেষ দিন। আমার বিশ্বাস, আমাদের জীবদ্দশায় এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন।”
ট্রাম্পের এই ভাষণের সমালোচনা করেছেন সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার। তিনি এই বক্তব্যকে ‘হতাশাজনক সমাপনী বার্তা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনকে ধাক্কা সুপ্রিম কোর্টের:
এদিকে, সোমবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। ওই আবেদনে ক্যালিফোর্নিয়াকে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের কাছে ডাকযোগে ভোটের ব্যালট পাঠানো থেকে বিরত রাখার আর্জি জানানো হয়েছিল। ওই ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব নিয়ে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলেছিল।
প্রথমে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার অ-মার্কিন নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে সেই সংখ্যা সংশোধন করে ২০ হাজার করা হয়। ইতিমধ্যেই আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে যাওয়ার পর প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে মামলা দায়ের করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে যাতে ব্যালট পাঠানো না হয়, সেই আবেদন জানানো হয়েছিল।
কিন্তু কোনও ব্যাখ্যা না দিয়েই স্বাক্ষরবিহীন এক লাইনের নির্দেশে ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচনের ঠিক এক দিন আগে এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।