পার্থপ্রতিম ঘোষ, অরিত্রিক ভট্টাচার্য ও অনির্বাণ বিশ্বাস, ফলতা : মহিলাদের মারধর, নির্যাতনের হুমকির মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায়। তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের গ্রেফতারি চেয়ে পথে নামলেন মহিলারা। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির কথা।
কেউ বলছেন, “ঘরে ঘরে ঢুকে মহিলাদের নির্যাতনের হুমকি দিচ্ছে।” কেউ আবার বলছেন, “শাসিয়ে রেখেছে, কেটে ফেলে দেব। শাসিয়ে রেখেছে।” হুমকি, মারধর, মহিলাদের উপর অত্যাচার, জোর করে ভোট আদায়। ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ উঠল তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদে পথে নামলেন মহিলারা। ভোট মিটতেই ধুন্ধুমার বাঁধল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায়। ফলতার এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাদের নিরাপত্তা দরকার আছে। গণনা হয়নি তাতেও এই অবস্থা। গণনা হলে কী হবে ?” এই আবহেই অনেকের মনে পরে যাচ্ছে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির কথা। সেখানকার একসময়ের ত্রাস তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহান ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধেও ঠিক এভাবেই রাস্তায় নেমেছিলেন মহিলারা। ২০২৪-এ লোকসভা ভোটের আগে উত্তাল হয়েছিল সন্দেশখালি। আর এবার বিধানসভা ভোট শেষ হতেই সন্দেশখালির ধাঁচে রাস্তায় নামলেন ফলতার মহিলারা। তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান ইসরাফিল চকদারের বিরুদ্ধে একের পর এক মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “২০২১ সাল থেকে আমাদের গ্রাম পঞ্চায়েতে ভোট দিতে দিচ্ছে না। মানুষকে হুমকি, দোর দিয়ে রেখে দিয়েছে। ঘরে ঘরে ঢুকে মহিলাদের নির্যাতনের হুমকি দিচ্ছে পার্টির লোকেরা। তৃণমূল পার্টি।” অপর এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা চাই। মহিলা নিরাপত্তা চাই। পথে ঘাটে বাড়িতে সব জায়গায় আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া হোক।”
ফলতায় ভোটারদের ‘হুমকি’, গ্রেফতার ৩ তৃণমূল কর্মী
সন্দেশখালিতে শুধু মহিলাদের উপর অত্যাচারই নয়, জোর করে জমি দখল, চাষের জমিতে নোনাজল ঢুকিয়ে ভেড়ি তৈরির মতো অভিযোগও উঠেছিল তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে। ফলতায় পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধেও উঠল ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ। এক বাসিন্দা বলেন, “একুশ সালে আমার ঘর, ১০ লক্ষ টাকার মাল লুঠ করেছে। একুশ সালে লুঠ করার পর ১৯ রকম ক্ষতি করেছে। এবার আমাদের ৫ জনকে ভোটও দিতে দেয়নি। তোরা কেন আমার ছেলেকে মারলি কেন?” অপর এক বাসিন্দার কথায়, “৫ বছর আগে যে ভোট হয়েছিল তখনও আমাদের গ্রামের মেয়েদের, যারা বিজেপি করেছিল সেই বাড়ির মেয়েদের ধরে ৫ বছর আগে মেয়েদের ধরে মেরেছে। আমরা দেখেছি। আমরা খুব ভয়ে ঘর থেকে বেরোতে পারিনি। এবছরও ৫ বছর পরে সেম।”
দীর্ঘদিন ধরে মহিলাদের ক্ষোভ জমতে জমতে, তার বিস্ফোরণ হয়েছিল সন্দেশখালিতে। কার্যত একই ছবি এবার ফলতায়।
অন্যদিকে, ফলতায় বিক্ষোভের নেপথ্যে অন্য অঙ্ক দেখছে তৃণমূল। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য় সহ সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন, “১৫টা বুথে পুনর্নির্বাচন করল, যেটা আজ হয়েছে। সেখানে ফলতার ব্যাপারে কিছু বলেছে ? না বলেনি। তাহলে আজ হঠাৎ এই অভিযোগ, কিছু মহিলা, কিছু বিক্ষোভ গজিয়ে উঠল কী করে ? নির্বাচনের দিন হল না, ৩০ তারিখ হল না। ১ তারিখ হল না। ২ তারিখ হঠাৎ এটা গজিয়ে উঠল কী করে ? এটাই আপনাদেরও প্রশ্ন করা উচিত।” পাল্টা কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার বলেন, “জাহাঙ্গির খানকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফলতার একটা হিন্দুপ্রধান এলাকায়, যেখানে হিন্দু জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে জোর করে জাহাঙ্গির খানকে নেতা বানিয়েছেন। তাঁকে প্রার্থীপদও দিয়েছে। সেখানে জাহাঙ্গির খান এবং যে নেতাদের নাম বলছেন, তাঁরা অত্যাচার করেন।”
সব মিলিয়ে ভোটের ফল বেরনোর আগে ফলতার ঘটনা ঘিরে তপ্ত রাজনীতি।