তবে এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও অর্থনীতিবিদ এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, আশঙ্কার তুলনায় বৃদ্ধি অনেকটাই কম। হরমুজ প্রণালীর সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে বড়সড় প্রভাব পড়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দামও অত্যন্ত অস্থির অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতে জ্বালানির দামে বড় অঙ্কের বৃদ্ধি হতে পারে বলে অনেকেই মনে করেছিলেন। কিন্তু সরকার এবং তেল বিপণন সংস্থাগুলি আপাতত সীমিত হারে দাম বাড়িয়ে এক ধাক্কায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ এড়ানোর চেষ্টা করেছে।
৩ টাকা দাম বৃদ্ধি প্রথমে খুব বড় মনে না হলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে বহু ক্ষেত্রে পড়ে।
বিশেষ করে ডিজেল ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার মূল ভরসা। ট্রাক, বাস, কৃষি যন্ত্র, জেনারেটর এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্কের বড় অংশই ডিজেলে চলে। ডিজেলের দাম বাড়লে ধীরে ধীরে পরিবহণ ব্যয় বাড়তে শুরু করে। পেট্রোলের প্রভাব সাধারণ যাত্রীদের উপর বেশি পড়লেও ডিজেলের প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার দামের উপর পড়ে।
এই কারণেই সরকার সাধারণত জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে। কারণ একবার বড় বৃদ্ধি হলে তা খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহণ খরচ এবং পরিষেবার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য পরিবহণে।
সবজি, ফল, শস্য এবং দুগ্ধজাত পণ্য মূলত ডিজেলচালিত ট্রাকের মাধ্যমে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পৌঁছে যায়। সাধারণত ছোটখাটো মূল্যবৃদ্ধির পরে পরিবহণ সংস্থাগুলি সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া বাড়ায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন ডিজেলের দাম বেশি থাকলে অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের উপরেই চাপানো হয়।
বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন পণ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব বেশি হতে পারে। কারণ কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড ট্রান্সপোর্ট এবং দ্রুত ডেলিভারি পরিষেবা জ্বালানির উপরই নির্ভরশীল।
বিমান সংস্থাগুলির উপরও চাপ বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী সংকট এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার জেরে বিশ্বজুড়ে জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের তুলনায় এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল, ডিজেল এবং পেট্রোলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির উপর বেশি চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারতে বিমান সংস্থাগুলি প্রথমে যাত্রী সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় কিছুটা বাড়তি খরচ নিজেরাই বহন করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে ব্যস্ত রুটগুলিতে বিমান ভাড়া আবার বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ছুটির মরশুম এবং উৎসবের সময় এর প্রভাব বেশি দেখা যেতে পারে।
অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি এবং যাতায়াত পরিষেবার খরচও বাড়তে পারে।
ফুড ডেলিভারি সংস্থা, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং ক্যাব পরিষেবাগুলির ব্যবসায় জ্বালানির খরচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুরুতে বেস ভাড়া অপরিবর্তিত থাকলেও ধীরে ধীরে সার্জ প্রাইসিং, প্ল্যাটফর্ম ফি এবং ডেলিভারি চার্জ বাড়তে পারে।
গ্রামীণ অর্থনীতি ডিজেলের দামের উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
চাষিরা ট্রাক্টর, সেচের পাম্প এবং ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডিজেল ব্যবহার করেন। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে চাষের খরচও বাড়ে, বিশেষ করে বপন এবং ফসল কাটার মরশুমে।
যদি দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানির দাম উঁচু থাকে, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের দামের উপরও পড়তে পারে।
এই মুহূর্তে ৩.০৮ টাকা মূল্যবৃদ্ধি হয়তো আশঙ্কার তুলনায় নিয়ন্ত্রিত বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু এর প্রকৃত প্রভাব ধীরে ধীরে সামনে আসবে — পরিবহণ ব্যয়, খাদ্যদ্রব্যের দাম, লজিস্টিক খরচ এবং নিত্যদিনের পরিষেবার মাধ্যমে, যেগুলি জ্বালানির উপর নির্ভর করেই চলে।