বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন বিজেপি-র বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীন৷ তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ায় এই আসনটি খালি হয়৷ বাঁকিপুর কেন্দ্রটি পটনা সাহিব লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে৷ পটনা সাহিব লোকসভা কেন্দ্রটিও বিজেপি-র শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত৷ ফলে বিহারের শহরাঞ্চলে বিজেপি-র জনপ্রিয়তার প্রতিফলনও ঘটে পটনা সাহিব, বাঁকীপুরের মতো কেন্দ্রগুলির নির্বাচনের ফলাফলে৷ তাই এই হার বিজেপি-র জন্য কিছুটা হলেও চিন্তার৷
অন্যদিকে দেশের অন্যতম সফল ভোট কুশলী হিসেবে পরিচিত প্রশান্ত কিশোরের জন্যও বাঁকিপুরের উপনির্বাচনের মধ্যে দিয়েই ভোটের ময়দানে অভিষেক ঘটালেন৷ গত বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর বাঁকিপুরের ভোটকে সম্মানের লড়াই হিসেবেই নিয়েছিলেন পিকে৷ সেই লড়াইয়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ তিনি৷ শুধু এনডিএ নয়, বিহারের রাজনীতিতে আরজেডি-র নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের বিকল্প হিসেবেও নিজের দলকে তুলে ধরতে সফল প্রশান্ত কিশোর৷
বাঁকিপুরের উপনির্বাচনের ঠিক আগেই নিট প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল যন্তর মন্তর৷ সেই আন্দোলনের আঁচ এসে পড়েছিল পটনাতেও৷ ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানী পটনা সহ বিহারের একাধিক শহরে৷ এই ছাত্র আন্দোলনের পরে বাঁকিপুরের উপনির্বাচন বিজেপি-র কাছে প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল৷ বিরোধীদের দাবি ছিল, ছাত্রদের অসন্তোষের প্রভাব ভোটের ফলে পড়বে৷ নতুন এবং তরুণ প্রজন্মের ভোটাররাও বিজেপি-র থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবেন বলেই দাবি করেছিল বিরোধীরা৷
স্বভাবতই বাঁকিপুরে বিজেপি-র হারের পর প্রশ্ন উঠছে, ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব কি সত্যিই উপনির্বাচনের ফলে পড়ল? সত্যিই শহুরে ভোটাররা মুখ ঘোরালেন বিজেপি-র থেকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ছাত্র আন্দোলনের জেরেই বিজেপি-কে বাঁকিপুর হারাতে হল বা শহুরে ভোটাররা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, এত সহজে এই উপসংহার টানা ঠিক হবে না৷ কিন্তু ভোটদানের প্রবণতায় যে ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই৷
জন সূরজ পার্টির জন্য এই জয় বিধানসভায় একটি আসন পাওয়ার থেকেও অনেক বেশি অর্থবহ৷ গত বিধানসভা নির্বাচনে জন সূরজ পার্টি মুখ থুবড়ে পড়ার পর নিন্দুকরা বলেছিলেন, অন্য দলের হয়ে সফল ভোট কুশলী হয়েও নিজের দলের ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হলেন প্রশান্ত কিশোর৷ নিজের রাজনৈতিক কৌশলকে ভোটে পরিণত করতে ব্যর্থ তিনি৷ বাঁকীপুরের এই জয় ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরকে রাজনীতিবিদ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করল৷
বাঁকীপুরের এই জয় আরও বেশি সংখ্যক কর্মী, সমর্থককে আকৃষ্ট করা, স্থানীয় স্তরের নেতাদের দলে টানা এবং রাজনৈতিক জোট গড়ার ক্ষেত্রেও জন সূরজ পার্টিকে নতুন অক্সিজেন দিল৷
বাঁকিপুরে প্রশান্ত কিশোরের জয় বিহারের রাজনীতিতে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিতে পারে৷
এতদিন বিহারের রাজনীতি মানেই মূলত এনডিএ বনাম আরজেডি-র নেতৃত্বাধীন জোটের লড়াই ছিল৷ বাঁকিপুরে জয়ের উপর ভিত্তি করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করতে পারলে বিহারের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে প্রশান্ত কিশোরের জন সূরজ পার্টি৷ বিশেষত শহরাঞ্চল, শিক্ষিত এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে বিকল্প হয়ে উঠতে পারে জন সূরজ পার্টি৷
তবে এটাও ঠিক যে একটি উপনির্বাচনের ফল দিয়েই বিহারের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে বিজেপি-র দাপট কমে গেল৷ উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই স্থানীয় ইস্যু, সমস্যা ভোটের ফলকে নির্ধারণ করে৷ প্রার্থী পরিচয়, ভোটদানের কম হার হওয়াও ফলাফল নির্ধারণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷
বাঁকিপুরের ফলাফল বিজেপি-কে অবশ্যই কয়েকটি বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করবে৷ ছাত্র আন্দোলনের জের, প্রার্থী নির্বাচন এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ায় শহরাঞ্চলের ভোটারদের সমর্থন কমল কি না, এই প্রশ্নগুলির উত্তর নিশ্চিত ভাবেই খুঁজতে হবে পদ্ম শিবিরকে৷ অন্যদিকে রাজনীতির ময়দানে পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে নির্বাচনী লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার মঞ্চ পেয়ে গেল প্রশান্ত কিশোরের জন সূরজ পার্টি৷ সার্বিক ভাবে বিহারের রাজনীতিতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পথ খুলে দিল বাঁকিপুরের উপনির্বাচন৷