ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর জন্য স্টারলিঙ্কের পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন মাস্ক। আর তা নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা। সিকোরস্কিকে ‘স্মল ম্যান’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন মাস্ক।
মাস্ক লেখেন, “আমি শুধু এটুকুই বলছি যে স্টারলিঙ্ক না থাকলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কারণ, রাশিয়া অন্য সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারে! আমরা কখনও এমন কাজ করব না, কিংবা স্টারলিঙ্ককে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করব না।”
কিন্তু এর কয়েক মাস আগেই ইউক্রেন কতটা স্টারলিঙ্কের উপর নির্ভরশীল, তা নিজেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মাস্ক। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তিনি দাবি করেছিলেন, “আমার স্টারলিঙ্ক ব্যবস্থা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড। আমি যদি এটি বন্ধ করে দিই, তা হলে ইউক্রেনের সামনের সারির সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।”
এই মন্তব্যের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইউক্রেনকে আমেরিকার সাহায্য করা নিয়ে বিতর্কে তাঁর প্রভাব বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসনে মাস্কের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা শেষ হয়ে গেলেও স্টারলিঙ্কের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল। ফলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল, সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা তাঁর হাতেই ছিল।
I literally challenged Putin to one on one physical combat over Ukraine and my Starlink system is the backbone of the Ukrainian army. Their entire front line would collapse if I turned it off.
What I am sickened by is years of slaughter in a stalemate that Ukraine will inevitably lose.
Anyone who really cares, really thinks and really understands wants the meat grinder to stop.
PEACE NOW!!
— Elon Musk (@elonmusk) March 9, 2025
পরে অবশ্য স্টারলিঙ্ক ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন মাস্ক। তিনি লেখেন, “একটা বিষয় একেবারে স্পষ্ট করে দিতে চাই। ইউক্রেনের নীতি নিয়ে আমার যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন, স্টারলিঙ্কের টার্মিনালগুলি কখনও বন্ধ করা হবে না।”
তবে ইউক্রেনে স্টারলিঙ্কের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। একটি দেশের সামরিক অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা একটি বেসরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাস্ক জানিয়েছিলেন, আগের বছর তিনি ইউক্রেনকে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরে থাকা নৌবহরের উপর হামলা চালাতে বাধা দিয়েছিলেন। কারণ, ক্রিমিয়া উপদ্বীপের কাছে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু করতে তিনি রাজি হননি। তাঁর এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছিল ইউক্রেনের প্রশাসন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, এক্ষেত্রে কোনও বেসরকারি সংস্থার সিদ্ধান্ত কীভাবে সরাসরি সামরিক অভিযানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঘটনাটিই ভারতের জন্য স্টারলিঙ্কের ঝুঁকি নিয়ে তৈরি একটি প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘তক্ষশশীলা ইনস্টিটিউশন’-এর Starlink and Risks for India শীর্ষক গবেষণাপত্রে এই বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাপত্রটি লিখেছেন অশ্বিন প্রসাদ রাও, আদিত্য রামানাথন এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল কে পি এম দাস।
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করার পর ইউক্রেনে স্টারলিঙ্ক পরিষেবা চালু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ইউক্রেনের সরকার এবং সেনাবাহিনীর যোগাযোগের জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু এতটা নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও মাস্ক একাধিকবার ইউক্রেনের স্টারলিঙ্ক ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ‘জিওফেন্সিং’ প্রযুক্তি। সহজ ভাষায়, কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় পরিষেবা চালু বা বন্ধ রাখার ব্যবস্থাই হল জিওফেন্সিং। ক্রিমিয়ার কাছে স্টারলিঙ্ক পরিষেবা চালু করার জন্য ইউক্রেনের সেনাবাহিনী অনুরোধ জানালেও মাস্ক তাতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে চলমান সামরিক অভিযানেও প্রভাব পড়েছিল।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কারণে সরকার কোনও এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে চাইলে সেখানে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু থাকতে পারে। আবার যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন এই পরিষেবা বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। কোনও বিদেশি সংস্থা পরিষেবা চালু রাখার আশ্বাস দিলেই যে তার উপর পুরোপুরি নির্ভর করা যায়, এমন নয়। স্টারলিঙ্ককে কখনও দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না বলে মাস্ক আশ্বাস দিলেও, ইউক্রেনে পরিষেবা ব্যবহারে বিধিনিষেধ এবং ক্রিমিয়ার কাছে পরিষেবা চালু করতে অস্বীকার করার ঘটনা সেই আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
স্টারলিঙ্কের পরিষেবা বন্ধ করতে গেলে সরকারগুলিকে কী ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হয়, তা নিয়েও আলোচনা করেছে তক্ষশশীলা ইনস্টিটিউশনের গবেষণাপত্রটি। ইউক্রেনে স্টারলিঙ্কের ব্যবহার ব্যাহত করতে রাশিয়া বারবার ইলেকট্রনিক যুদ্ধের কৌশল ব্যবহার করেছে। কিন্তু তাতে খুব বেশি সাফল্য আসেনি।
রাশিয়ার সেনাবাহিনী জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করার চেষ্টা করেছে। এর ফলে স্টারলিঙ্ক টার্মিনালগুলির পক্ষে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করা এবং স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও, টার্মিনাল থেকে স্যাটেলাইটে তথ্য পাঠানোর জন্য যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়, সেগুলিকেও নিশানা করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সেনা ও অপারেটররা যোগাযোগ ব্যবস্থার কার্যক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এমনকী অডিয়ো এবং ভিডিয়ো কল করতেও সমস্যা হয়েছিল।
তবে স্টারলিঙ্কের প্রযুক্তিগত কাঠামোর কারণে দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা কঠিন। এর স্যাটেলাইটগুলি পৃথিবীর অনেক কাছের কক্ষপথে ঘোরে এবং দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। অন্যদিকে, স্টারলিঙ্কের টার্মিনালগুলিতে এমন বিশেষ অ্যান্টেনা থাকে, যা কোনও যান্ত্রিক অংশ না ঘুরিয়েই ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্যাটেলাইটের দিকে সংকেত পাঠাতে পারে।
একটি টার্মিনাল কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই একটি স্যাটেলাইটের পরিবর্তে অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। ফলে একটি সংযোগে বাধা সৃষ্টি করলেই গোটা পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায় না।
গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়ার জ্যামিং বা সিগন্যাল বাধা দেওয়ার চেষ্টা মোকাবিলা করতে স্পেসএক্স স্টারলিঙ্ক টার্মিনালগুলিতে সফটওয়্যার আপডেট পাঠিয়েছে। ২০২২ সালে মাস্ক দাবি করেছিলেন, সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়ার জ্যামিংয়ের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ পরিষেবা দেওয়া সংস্থাগুলির উপর সরকার কঠোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত আরোপ করতে চায়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মণিপুরে একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর কাছ থেকে স্টারলিঙ্কের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছিল ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। এর পর এক্স-এ মাস্ক লেখেন, “এই তথ্য ভুল। ভারতের আকাশসীমার উপর স্টারলিঙ্কের স্যাটেলাইট বিম বন্ধ রয়েছে।”
কিন্তু গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিষয়টি এতটা সরল নাও হতে পারে। জিওফেন্সিং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে মায়ানমার সীমান্ত লাগোয়া মণিপুরের কিছু এলাকায় ওই যন্ত্রগুলি কাজ করে থাকতে পারে। উদ্বেগের বিষয় শুধু এই নয় যে স্টারলিঙ্কের সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে। বরং, নিষিদ্ধ এলাকায় এই পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এর প্রায় দু’সপ্তাহ আগে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাচারকারীদের স্টারলিঙ্ক যন্ত্র ব্যবহার করার ঘটনা সামনে এসেছিল। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ভারত সরকার ওই ব্যবহারকারীদের পরিচয় এবং তাঁরা কীভাবে এই পরিষেবা ব্যবহার করেছেন, সেই সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়েছিল। কিন্তু স্টারলিঙ্ক তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন দেখিয়ে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। সংস্থাটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আমেরিকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে অথবা আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনে তথ্য চাওয়ার পরামর্শ দেয়।
গবেষণাপত্রে আমেরিকা সরকারের স্পেসএক্সের উপর প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য আমেরিকা সরকারের চুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, রেডিও স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং কক্ষপথ ব্যবহারের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ফলে সংস্থাটির উপর আমেরিকা সরকারের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে, যেখানে আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে, সেখানে ওয়াশিংটন স্পেসএক্সের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে ভারতের স্টারলিঙ্ক পরিষেবা থেকে সংগৃহীত তথ্য আমেরিকার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হতে পারে। আবার কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিষেবা চালু রাখা বা বন্ধ করার সিদ্ধান্তেও আমেরিকার স্বার্থ প্রাধান্য পেতে পারে। অর্থাৎ, ভারতের স্বার্থের পরিবর্তে আমেরিকার স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়া উচিত। কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে, অথচ সেই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ থেকে যেতে পারে একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে। আর সেই সংস্থা কোন সময় পরিষেবা চালু রাখবে, কখন সীমাবদ্ধতা আরোপ করবে, তার উপর নির্ভর করতে পারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।