গত বছর ভ্লাসেঙ্কোকে ভার্টুন নামে পরিচিত একটি ফ্রন্টলাইন পোস্টে মোতায়েন করা হয়েছিল। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাস্কি ছদ্মনামের এক সহযোদ্ধা। ভ্লাসেঙ্কোর বয়ান অনুযায়ী, তাঁদের থাকার জায়গায় ছিল একটি কংক্রিটের নিকাশি পাইপ এবং তার সঙ্গে লাগোয়া একটি মাটির নীচের আশ্রয়স্থল। ড্রোনের মাধ্যমে তাঁদের কাছে খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হত। ভ্লাসেঙ্কোর জন্মদিনে পাঠানো পার্সেলে চকোলেট এবং দামি সিগারেটও ছিল বলে জানা গিয়েছে।কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আকাশে রুশ ড্রোনের আধিপত্য বাড়তে থাকে।
ভ্লাসেঙ্কোর কথায়, “ওদের কাছে এত বেশি ম্যাভিক ড্রোন ছিল যে মনে হত, আকাশটাই নোংরা হয়ে গিয়েছে।” তাঁদের জায়গায় দায়িত্ব নিতে পাঠানো দু’জন সেনা সেখানে পৌঁছনোর আগেই নিহত হন। তাঁদের দেহ উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দু’জন সেনার মৃত্যু হয়। এরপর ভ্লাসেঙ্কো কমান্ডারদের অনুরোধ করেন, তাঁদের উদ্ধারের জন্য যেন আর কোনও সেনাকে পাঠানো না হয়। তিনি বলেন, “আমি একা মরতে রাজি, কিন্তু আমার জন্য আরও কাউকে মরতে দেখতে চাই না।”
কিন্তু ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাঙ্কারে জল ঢুকে পড়ায় সেখানে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। বাধ্য হয়ে ভ্লাসেঙ্কো ও বাস্কি একটি ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলে আশ্রয় নেন। খাবার ও শুকনো পোশাকের একটি পার্সেল সংগ্রহ করতে বাইরে বেরোতেই তাঁদের গতিবিধি নজরে পড়ে রুশ নজরদারি ড্রোনের। এরপর আর একটি ড্রোন তাঁদের উপর হামলা চালায়।
১৬ ফেব্রুয়ারি, নিজের ৫০তম জন্মদিনেই মৃত্যু হয় সঙ্গী বাস্কির। রাশিয়ার ড্রোন হামলায় গুরুতরভাবে আহত হন ভ্লাসেঙ্কো। তাঁর বাঁ পায়ের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত পা-টি পচে নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, পড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর ডান পা। ভ্লাসেঙ্কো বলেন, “ততক্ষণে আমি হাত-পায়ের উপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছিলাম।” ঠিকমতো চলাফেরা করতে না পেরে স্কুলের পুরনো বয়লারের নীচে একটি ছোট্ট জায়গায় আশ্রয় নেন তিনি। মাসের পর মাস সেখানেই কাটে তাঁর।
ভ্লাসেঙ্কোর ডান পায়ের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। তাঁর দাবি, হাড় চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসছিল। খাবারের পার্সেল সংগ্রহ করতে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরোতে হত। তাতে আঘাত আরও বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত নিজেই পা কেটে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ভ্লাসেঙ্কো বলেন, “পা-টা একটা ইটের উপর রাখলাম, হাতে নিলাম ছুরি। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। আমাকে পা-টা কাটতেই হয়েছিল।” রক্তপাত বন্ধ করতে টুর্নিকেট ব্যবহার করেন তিনি। পরে নিজের কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলার সময় পরিস্থিতি নিয়ে রসিকতাও করেছিলেন। তিনি বলেন, “এখন আর আমার ফ্ল্যাট ফুট নেই, পায়ের মাপও ৪৪ নেই।”
ভাঙা স্কুলের ওই ছোট্ট খুপরিতে একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করতে অন্যদের সঙ্গে রেডিয়োর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। ভ্লাসেঙ্কোর কথায়, “আমি একা নই, অন্য কারও কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি—এই অনুভূতিটাই আমার কাছে আনন্দের ছিল।” এই কঠিন সময়ে তাঁর ইউনিট যে তাঁকে ছেড়ে যায়নি, সে কথাও জানিয়েছেন তিনি। “ভীষণ একা লাগত। ওরা আমাকে পরিত্যাগ করেনি। আমার কমান্ডও আমাকে ছেড়ে যায়নি,” বলেন ভ্লাসেঙ্কো। তাঁর স্ত্রী তাঁর কাছে স্টিফেন কিংয়ের একটি বই পাঠিয়েছিলেন। সেই বই পড়েই সময় কাটাতেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে ছিল রাশিয়ার সেনার হুমকিও৷ ভ্লাসেঙ্কো যখন ওই ছোট্ট আশ্রয়ে বন্দি, তখন একটি রুশ ড্রোন তাঁর আশ্রয়ের কাছে লাউডস্পিকার ফেলে যায়। ভ্লাসেঙ্কোর দাবি, সেই লাউডস্পিকার থেকে একটি রেকর্ড করা বার্তা শোনানো হয়েছিল।
সেই বার্তায় বলা হয়েছিল, “ভাই, আমরা জানি তুমি এখানে রয়েছ। বিশ্বাস করো, তোমার সহযোদ্ধারা তোমাকে বাঁচাতে আসবে না।”
এত হুমকি সত্ত্বেও প্রতি চার-পাঁচ দিন অন্তর ড্রোনের মাধ্যমে তাঁর কাছে খাবার, ওষুধ, সিগারেট ও মিষ্টি পৌঁছে দেওয়া হত বলে ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম Oboronka জানিয়েছে।
ভ্লাসেঙ্কোকে উদ্ধারের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল অ্যালেক্স ছদ্মনামের এক আধিকারিকের উদ্যোগে। তিনি ব্যাটালিয়নের ড্রোন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম Oboronka-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম প্রস্তাব থেকে চূড়ান্ত অভিযান পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছিল।
পরবর্তী সময়ে সামরিক আধিকারিকরা ইউক্রেনের সংস্থা Gurzuf Defence-এর তৈরি একটি ভারী ড্রোনের সন্ধান পান। ছয়টি রোটর এবং কালো কাঠামোর এই ড্রোনটি দেখতে অনেকটা বিশাল কোনও পতঙ্গের মতো।
ফ্রন্টলাইনে দীর্ঘদিন কাটানোর পর ভ্লাসেঙ্কোর ওজন আনুমানিক ৭০ কেজি ছিল বলে মনে করা হয়েছিল।
উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ, বড় ও ধীরগতির ড্রোনগুলি ছোট রুশ ড্রোনের হামলার সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। অক্টোবরের গোড়ায় অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়। সেই সময় ড্রোনের মাধ্যমে পাঠানো পার্সেলে ভ্লাসেঙ্কোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বিশেষ হারনেস এবং নির্দেশমূলক ভিডিয়ো-সহ একটি ফোন। ড্রোনের পাইলট ব্ল্যাক ছদ্মনামের ওই ব্যক্তি ইউক্রেনীয় ও রুশ ভাষায় লিখিত নির্দেশিকাও পাঠিয়েছিলেন।
৪ অক্টোবর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ভারী ড্রোনটির সঙ্গে প্রতারণামূলক লক্ষ্য হিসেবে তিনটি ছোট ড্রোনও উড়ছিল, যাতে শত্রুপক্ষের নজর অন্যদিকে সরানো যায়।
প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে হামলাকারী ড্রোন, কামান এবং ফিক্সড-উইং ড্রোনের সাহায্যে রুশ ড্রোনের পরিচিত অবস্থানগুলিকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়। উড়ানের পথে দুটি স্থলভিত্তিক দলকে রাখা হয়েছিল, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোনের ব্যাটারি বদলে দেওয়া যায়।
Oboronka-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানে অংশ নিয়েছিল ইউক্রেনের ৩০তম, ১৪তম ও ৪৩তম মেকানাইজড ব্রিগেড এবং ১০ম আর্মি কর্পসের সদস্যরা।
ভ্লাসেঙ্কো জানিয়েছেন, অভিযানের সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা একটি এসকর্ট ড্রোনকে গুলি করে নামিয়ে দেয় শত্রুপক্ষ।
ড্রোনে চড়ে এতটা উচ্চতায় ওঠা নিয়ে অবশ্য খুব একটা ভয় পাননি তিনি। কিন্তু একটি নদীর উপর দিয়ে যাওয়ার সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।
ভ্লাসেঙ্কো বলেন, “আমি যেটাকে ভয় পাচ্ছিলাম, সেটা হল জল। আমি সাঁতার জানি না।”
উড়ানের সময় ড্রোনের ক্যামেরার দিকে ‘সব ঠিক আছে’ বোঝাতে ইশারা করেন তিনি। এমনকি, হাত দিয়ে হৃদয়ের আকৃতিও তৈরি করেন।
ড্রোনটি দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন ব্ল্যাক। আহত সেনাকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ব্ল্যাক বলেন, “আমি জানতাম, নীচে একজন মানুষ রয়েছেন। তাঁকে যত দ্রুত সম্ভব এবং যতটা নিরাপদে সম্ভব পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম।”
উদ্ধারের পর ভ্লাসেঙ্কোকে খারকিভের একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর একাধিক অস্ত্রোপচার হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম পা লাগানো এবং দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে তাঁকে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে কীভাবে টিকে ছিলেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তরে ভ্লাসেঙ্কো তাঁর মেয়ের কথা বলেন। দীর্ঘদিন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি।
ভ্লাসেঙ্কো বলেন, “অনেক দিন মেয়ের সঙ্গে কথা হয়নি। হয়তো ও একদিন আমাকে বুঝতে পারবে। কারণ, বাবা যুদ্ধে ছিল।”