পরমাণু ইস্যুতে পাথরের মতো অনড় ইরান:
তেহরানে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইরানের পরমাণু প্রধান মহম্মদ ইসলামি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আমেরিকার হুমকিতে ইরানের উপর কোনও প্রভাব পড়বে না। সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য কোনও চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরান তার মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোনও দেশে স্থানান্তর করবে কি না, অথবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে কি না। এর উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ‘না’ বলে জানিয়ে দেন।
অবিচ্ছেদ্য অংশ: মহম্মদ ইসলামি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইরানের পরমাণু প্রযুক্তি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’। এটি বন্ধ করা বা পরিত্যাগ করা ইরানের পক্ষে অসম্ভব।
হুমকি প্রত্যাখ্যান: আমেরিকার হুমকি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে তিনি বলেন, সামরিক হামলা এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকি ইরানের কাছে নতুন কিছু নয়। ইরান আইন মেনে তার অসামরিক ও বৈজ্ঞানিক পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
ইরানের এই কঠোর অবস্থান প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক অবরোধ সত্ত্বেও তেহরান কোনও মূল্যের বিনিময়েই তার পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তাবলয় হারাতে চায় না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘৩ নভেম্বর’ সংক্রান্ত মহাট্যুইস্ট:
ইরানের এই কঠোর বক্তব্যের মধ্যেই আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিবৃতি সামনে এসেছে, যা এই যুদ্ধে বড়সড় রাজনৈতিক মোড় এনে দিয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট শেয়ার করে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘আমরা ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করছি। আমি সকলের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিতে চাই যে, ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ এবং আমাদের অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর থাকবে। এর মধ্যে শুধুমাত্র গত রাতেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে রেকর্ড ২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রবাহিত হয়েছে, যার এক ব্যারেলও ইরানের ছিল না।’’ ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আমরা আর কোনও সময়েই ইরানের উপর হামলা চালাব না।’’ সবশেষে, বড় হাতের অক্ষরে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘ইরানকে কখনওই পরমাণু অস্ত্র পেতে দেব না।’’
নির্বাচনের আগে বড়সড় যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা: ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান পার্টি জানে যে, নির্বাচনের ঠিক আগে আমেরিকা যদি ইরানের সঙ্গে সরাসরি বড়সড় ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমেরিকার শেয়ার বাজার এবং বিশ্বব্যাপী তেলের দাম হঠাৎ আকাশছোঁয়া হয়ে যেতে পারে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব তাদের ভোটব্যাঙ্কের উপর পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ: ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি সামরিক হামলা না চালালেও ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য নৌ-অবরোধ জারি থাকবে, যাতে ইরানের এক ব্যারেল তেলও দেশের বাইরে বিক্রি করা না যায়।
বিকল্প পথ খুঁজে বের করার সময় পাওয়া যাবে: ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়ে আমেরিকা আসলে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য সময় দিচ্ছে, যাতে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত করতে বাধ্য করা যায়।
৩ নভেম্বরের তারিখ এবং আমেরিকার নির্বাচনী অঙ্ক:
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিবৃতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়সীমা এখন সরাসরি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
যুদ্ধ কি থেমে যাবে, নাকি ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা?
বিদেশনীতি ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের ‘৩ নভেম্বর’ সংক্রান্ত ঘোষণা যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং এটি শুধুমাত্র একটি সাময়িক বিরতি।
ইরানের পরমাণু প্রধানের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তেহরান আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধের সামনে মাথা নত করতে প্রস্তুত নয়। ইরান খুব ভালোভাবেই জানে যে, তারা যদি তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করে দেয় অথবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের হাতে কোনও শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা’ (ডিটারেন্স) অবশিষ্ট থাকবে না।
এমন পরিস্থিতিতে ৩ নভেম্বরের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড়সড় সামরিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে কোনও সুনির্দিষ্ট সমাধান না বেরোলে, আমেরিকার নির্বাচনের ঠিক পরেই ওয়াশিংটন ও ইজরায়েল একযোগে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে চূড়ান্ত ও সবচেয়ে বড় হামলা চালাতে পারে।
ইরানের জেদ এবং ট্রাম্পের সময়সীমা:
‘ছাড়ব না’—ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এই জেদ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘৩ নভেম্বর’ সংক্রান্ত সময়সীমা এই যুদ্ধকে অত্যন্ত জটিল দাবা খেলায় পরিণত করেছে। ইরান তার ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার রক্ষা করতে অনড়, অন্যদিকে আমেরিকা নির্বাচন পর্যন্ত নিজেদের হাত বেঁধে রেখে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
৩ নভেম্বর পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তপ্ত পরিস্থিতি সাময়িক শান্তির চেহারা নিতে পারে। কিন্তু এই তারিখ পেরিয়ে গেলেই যুদ্ধ তার সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।