স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী কে?
এটি সুচেতা কৃপালিনীর গল্প। সেই সুচেতা কৃপলানী, যাঁকে আজ আমরা উত্তর প্রদেশের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বাধীন ভারতের কোনও রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জানি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বহু আগেই তাঁর জীবনে এমন একটি অধ্যায় ছিল, যা পড়লে আপনার মুখে অনায়াসেই হাসি ফুটবে। চলুন, পুরো ঘটনাটি জেনে নেওয়া যাক।
সুচেতা কৃপালিনী কে ছিলেন?
সুচেতা কৃপালিনীর জন্ম ১৯০৮ সালের ২৫ জুন। সেই সময় তাঁর নাম ছিল সুচেতা মজুমদার। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী সুচেতা পরবর্তীতে Banaras Hindu University-এ সাংবিধানিক ইতিহাস পড়াতে শুরু করেন। সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন দেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাপে ফুটছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোড়নও ছিল প্রবল। কংগ্রেসের নেতারা তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
এই সময়েই সুচেতার জীবনে প্রবেশ করেন এক নতুন চরিত্র— Acharya Jivatram Bhagwandas Kripalani। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মতে, ১৯২৯ সালে সুচেতা বিএইচইউ-তে পড়াতেন এবং জে. বি. কৃপালিনী সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য স্বেচ্ছাসেবক খুঁজতে যেতেন। সেখানেই প্রথমবার তাঁদের পরিচয় হয়। প্রথম দেখাতেই প্রেমের কোনো উল্লেখ ইতিহাসে না থাকলেও, এটুকু স্পষ্ট যে সেখান থেকেই তাঁদের সম্পর্কের শুরু এবং ধীরে ধীরে তা এক বড় সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যায়।
কে ছিলেন জে. বি. কৃপালিনী, যাঁর প্রেমে পড়েছিলেন সুচেতা?
বর্তমান সময়ে অনেকেই হয়তো এই নামের সঙ্গে পরিচিত নন। আচার্য জে. বি. কৃপালিনী সেই সময়ে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম বড় মুখ ছিলেন। তাঁর পুরো নাম ছিল জীবতারাম ভগবানদাস কৃপালিনী। কংগ্রেসের উপর তাঁর ছিল শক্তিশালী প্রভাব। তিনি ছিলেন একজন দৃঢ় গান্ধিবাদী এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু রাজনীতিকই ছিলেন না, বরং সেই সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
সেই সময় সুচেতা তাঁর থেকে অনেকটাই ছোট ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বয়সের পার্থক্য ছিল প্রায় ২০ বছর। কিন্তু তাঁদের চিন্তাভাবনা ও আদর্শ ছিল এক। ফলে দেখা-সাক্ষাৎ বাড়তে থাকে, কথাবার্তা এগোয়, একসঙ্গে কাজ শুরু হয় এবং অবশেষে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা হয়তো সেই সময় খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিলেন— তাঁরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন।
এখান থেকেই শুরু হয় আসল নাটক:
এবার সেই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতির কথা ভাবুন। ১৯৩০-এর দশক—সমাজ তখন অনেক বেশি রক্ষণশীল ও প্রথানির্ভর। একদিকে একজন তরুণ, শিক্ষিত নারী, অন্যদিকে তাঁর থেকে ২০ বছর বড় এক জাতীয় নেতা। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের বিয়ের সিদ্ধান্ত শুধু পারিবারিক বিষয় হয়ে থাকেনি, তা সমাজজুড়েও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সুচেতা ও কৃপালিনীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।
২০ বছর বড় ব্যক্তিকে বিয়ে নিয়ে বিতর্ক:
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জে. বি. কৃপালিনী সুচেতার থেকে প্রায় ২০ বছরের বড় ছিলেন এবং দুই পরিবারের কেউই এই সম্পর্কের পক্ষে ছিল না। অর্থাৎ, বিয়ের পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রেমের চেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছিল বয়স, সমাজ ও পরিবারকে ঘিরে। তবে আসল মোড় তখনও বাকি ছিল।
যখন গান্ধিজিও এই সম্পর্কের পক্ষে ছিলেন না:
সুচেতা ও কৃপালিনীর গল্পকে স্মরণীয় করে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল এটি।
শুধু পরিবারই নয়, সেই সময় মহাত্মা গান্ধিও শুরুতে এই বিয়ের পক্ষে ছিলেন না। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এই বিয়ে হলে তিনি তাঁর অন্যতম প্রিয় সহযোদ্ধাকে হারাবেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, তিনি মনে করতেন বিয়ের পর কৃপালিনীর মনোযোগ আন্দোলন ও সংগঠন থেকে সরে যেতে পারে।
কিন্তু এখানেই সুচেতা যে উত্তর দিয়েছিলেন, সেটিই সম্ভবত এই গল্পের প্রাণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি গান্ধিজিকে বলেছিলেন— ‘‘এই বিয়ের পরে আপনি একজন নয়, দু’জন কর্মী পাবেন।’’
বিরোধিতা ছিল প্রবল, তবুও সুচেতা নিজের সিদ্ধান্ত বদলাননি:
পরিবারের আপত্তি, বিশাল বয়সের পার্থক্য, গান্ধীর প্রাথমিক আপত্তি—অন্য কারও গল্প হলে হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সুচেতা কৃপালিনীর গল্প এখান থেকেই নতুন দিকে মোড় নেয়। তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেননি।
অবশেষে ১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাসে সুচেতা মজুমদার ও আচার্য জে. বি. কৃপালিনীর বিয়ে হয়। যে বিয়েকে ঘিরে একসময় এত প্রশ্ন উঠেছিল, পরবর্তীকালে সেই সম্পর্কই ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়।
তবে সুচেতার গল্পকে শুধু প্রেমের গল্প ভাবলে ভুল হবে:
যদি এই গল্প শুধুই বিয়ে পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকত, তবে হয়তো এটি একটি ব্যক্তিগত ও আকর্ষণীয় ঘটনা হিসেবেই থেকে যেত। কিন্তু সুচেতা কৃপালিনীর প্রকৃত শক্তি ছিল এই যে, তিনি নিজেকে শুধু কোনও বড় নেতার স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত হতে দেননি।
বিয়ের পরও তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি All India Mahila Congress গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তিনি গোপন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি গণপরিষদের সদস্য হন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে সংসদের ঐতিহাসিক অধিবেশনে বন্দে মাতরম্ গাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও তাঁর নাম ছিল।
অর্থাৎ, সুচেতার গল্পে প্রেম রয়েছে, কিন্তু প্রেমের থেকেও বড় তাঁর নিজস্ব পরিচয় ও কৃতিত্ব।
যখন উত্তরপ্রদেশের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হলেন সুচেতা:
এই গল্পের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৬৩ সালের ২ অক্টোবর। সেদিন সুচেতা কৃপালিনী উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি উত্তর প্রদেশের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হন। শুধু তাই নয়, তিনি স্বাধীন ভারতের কোনও রাজ্যেরও প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
এবার গোটা গল্পটিকে শুরু থেকে একবার ভেবে দেখুন—একজন তরুণী, যিনি নিজের থেকে ২০ বছর বড় একজন নেতাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; যে সম্পর্ক নিয়ে পরিবার প্রশ্ন তুলেছিল; এমনকি শুরুতে মাহাত্মা গান্ধিও আপত্তি জানিয়েছিলেন। সেই নারীই পরবর্তীকালে দেশের বৃহত্তম রাজ্যগুলির একটির নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই কারণেই সুচেতা কৃপালিনীর গল্প শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি ভারতের ইতিহাসে এক অসাধারণ নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠা, সাহস এবং নেতৃত্বের কাহিনি।