শুরুতে স্বাভাবিক, পরে আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আমাইরা স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। সে এক বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানায় এবং পরে অন্য পড়ুয়াদের সঙ্গে নাচের ক্লাসেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ক্লাসে ফিরে আসার পর কয়েকজন পড়ুয়াকে একটি ডিজিটাল স্লেট নিয়ে খেলতে দেখা যায়। অভিযোগ, সেই স্লেটটি বারবার আমাইরাকে দেখানো হয়। এরপর থেকেই তার আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তাকে অস্বস্তিতে, লজ্জিত এবং ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে দেখা যায়।
ফুটেজ অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে আমাইরা একাধিকবার শ্রেণি শিক্ষিকার কাছে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা বোঝানোর চেষ্টা করে। পরিবারের দাবি, প্রতিবারই সে কোনও একটি বিষয় জানাতে চাইছিল। তবে অভিযোগ, প্রতিবারই আর এক পড়ুয়া শিক্ষিকার কাছে গিয়ে কথা বলার পর আমাইরার অভিযোগের দিক থেকে মনোযোগ সরে যায়। পরিবারের বক্তব্য, তাকে আলাদা করে ডেকে কথা শোনার পরিবর্তে বারবার নিজের আসনে ফিরে যেতে বলা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমাইরার উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছিল। একসময় তাকে হাত জোড় করে নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। পরে মুখ ঢেকে ফেলতে এবং মাথায় হাত দিতেও দেখা যায়, যা পরিবারের মতে প্রবল মানসিক ধাক্কার ইঙ্গিত বহন করে। পরিবারের অভিযোগ, শ্রেণি শিক্ষিকার আচরণ ছিল কড়া। তাঁদের দাবি, ওই সময় আমাইরাকে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল এবং সে নিজের কথা বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছিল।
ফুটেজে এরপর দেখা যায়, আমাইরা একাই শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। দ্রুত করিডর পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় সে। পরিবারের দাবি, নিচতলা থেকে চতুর্থ তলায় যাওয়ার পুরো সময়ে কোনও শিক্ষক বা স্কুলকর্মী তাকে অনুসরণ করেননি বা থামানোর চেষ্টা করেননি। গত ১ নভেম্বর, চতুর্থ তলার রেলিং থেকে প্রায় ৪৮ ফুট নিচে পড়ে যায় আমাইরা। তাকে দ্রুত একটি নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আমাইরার পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার তদন্তে পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। তারা জুভেনাইল জাস্টিস (JJ) আইন-এর কঠোর ধারায় শুধু শ্রেণি শিক্ষিকার বিরুদ্ধেই নয়, স্কুলের অধ্যক্ষ এবং চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ঘটনার পরের দিনই দুই সদস্যের একটি পরিদর্শন কমিটি নীরজা মোদি স্কুলে যায়। এরপর সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (CBSE) স্কুলটিকে শো-কজ নোটিস পাঠায়। বোর্ডের অভিযোগ, পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্কুলের ব্যবস্থায় একাধিক পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আমাইরার শ্রেণিকক্ষ ছিল নিচতলায়। তবু সে কীভাবে কারও নজরে না পড়ে চতুর্থ তলায় পৌঁছে গেল, তা বড় প্রশ্ন।
CBSE-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আমাইরা প্রায় ১৮ মাস ধরে সহপাঠীদের বুলিং বা হেনস্থার শিকার হচ্ছিল। তাকে অপমানজনক ও কুরুচিকর কথা বলা হতো। অভিযোগ, শ্রেণি শিক্ষিকা পুনীতা শর্মা বারবার আমাইরা এবং তার বাবা-মায়ের অভিযোগ গুরুত্ব না দিয়ে তা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এক সহপাঠীর বুলিংয়ের অভিযোগ নিয়ে আমাইরার বাবা শিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ওই সহপাঠীই পরে ডিজিটাল স্লেটে আপত্তিকর লেখা লিখেছিল বলে অভিযোগ। কিন্তু সেই সময় শিক্ষিকা নাকি বলেছিলেন, “অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।”
তদন্ত কমিটির রিপোর্টে আমাইরার শিক্ষক, সহপাঠী এবং অভিভাবকদের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সকলের দাবি, আমাইরা ছিল অত্যন্ত মেধাবী, প্রাণবন্ত ও বন্ধুসুলভ ছাত্রী। নীরজা মোদি স্কুলে সে ‘অল-রাউন্ডার’ পুরস্কারও পেয়েছিল।