মুম্বই: উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরের শিবসেনায় ভাঙন। জল্পনা সত্যি করে একনাথ শিন্ডের শিবসেনায় যোগ দিচ্ছেন ছয় বিদ্রোহী সাংসদ। সোমবার দুপুর ৩টেয় শিন্ডে-শিবসেনার সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন তাঁরা। লোকসভায় ন’জন সাংসদ উদ্ধব শিবসেনার, যার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই বিদ্রোহী। ফলে দলবিরোধী আইনে ডিসকোয়ালিফাই হওয়ার ঝুঁকি থাকছে না। (Shiv Sena Rebel MPs)
ওই ছয় বিদ্রোহী সাংসদদের মধ্যে একজন, ওমরাজে নিম্বালকর জানিয়েছেন, সব কিছু চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। উদ্ধব-শিবসেনা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেই তাঁরা দলবদলের পদক্ষেপ করলেন বলে দাবি ওমরাজের। তাঁর বক্তব্য, “যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নেমেছিলাম আমরা, কংগ্রেসের আমলেও তারা ফুলেফেঁপে উঠছিল, বিজেপি-র আমলেও। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যে লড়ব কী করে? আমার মনে হয়, ক্ষমতার রাস্তাই অনুসরণ করা উচিত আমাদের। কৃষকদের ট্রান্সফর্মার মেরামত করার মতো টাকাও পাওয়া যায় না। প্রতি বছর শুধু হিসেব হয়।” (Eknath Shinde)
বিদ্রোহীদের দলবদল আটকাতে ইতিমধ্যেই আবেদন জানিয়েছে উদ্ধব-সেনা। কিন্তু লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে এখনও জমা রয়েছে তাদের আবেদনপত্র। সেই আবহেই শিন্ডে-সেনায় যোগ দেওয়ার আর্জি জমা দিয়েছেন বিদ্রোহী সাংসদরা। শিন্ডে-শিবসেনাকেই ‘আসল শিবসেনা’ বলে দাবি করছেন তাঁরা। তবে শেষ পর্যন্ত স্পিকারের হাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত। এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে উদ্ধব বলেন, “আগেও এমন সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছি আমি। তাও আমাকে দুর্বল করতে পারেনি। নির্বাচনে এর বদলা নিতে হবে।” দলের সাংসদ সঞ্জয় রাউতের কথায়, “অনেকে এসেছিলেন, অনেকে চলেও গিয়েছেন। ঠাকরেরাই থেকে গিয়েছেন। কিছু যায় আসে না।”
তবে সাংসদদের এই বিদ্রোহে উদ্ধব-শিবসেনার যতটা না ক্ষতি হবে, তার চেয়ে শিন্ডে শিবসেনা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাতে বিজেপি-র উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, উদ্ধব-শিবসেনার ছয় সাংসদ যোগ দিলে, লোকসভায় শিন্ডে-শিবসেনার সাংসদ সংখ্যা বেড়ে হবে ১৩। অর্থাৎ সংখ্যার নিরিখে লোকসভায় মহারাষ্ট্র প্রদেশ কংগ্রেসের সমকক্ষ হয়ে উঠবে তারা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রে ১৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল কংগ্রেস। অন্য দিকে, লোকসভায় মহারাষ্ট্র থেকে বিজেপি-র সাংসদের সংখ্যা ন’জন। এই দলবদল হলে লোকসভার আসনের নিরিখে বিজেপি তৃতীয় স্থানে নেমে আসবে, লোকসভার সংখ্যা দেখিয়ে তাদের উপর ছড়ি ঘোরাবে শিন্ডে-সেনা, যা গেরুয়া-নেতৃত্বের মনঃপুত হবে না।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল হয়নি বিজেপি-র। তার পরও মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে ১৩২টি আসনে জয়ী হয় তারা। দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের নেতৃত্বে স্থানীয় নির্বাচনেও ভাল ফল করে তারা। উদ্ধব-সেনার সাংসদ ভাঙানোয় তাদের তরফে সবুজ সঙ্কেত ছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে তার নেপথ্যে অন্য অঙ্ক রয়েছে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তাঁদের দাবি, বাদল অধিবেশনে যেনতেন প্রকারে মহিলা সংরক্ষণের মোড়কে সীমানা পুনর্বিন্যাস পাস করিয়ে নিতে যায় নরেন্দ্র মোদি সরকার। তাই সম্প্রতি শিন্ডে-সেনাকে ‘আসল’ শিবসেনা বলে উল্লেখ করেন অমিত শাহও। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের NCPI-তে যোগদানও নেহাত কাকতালীয় ঘটনা নয় বলেই মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ট্রেনে ভিক্ষা করলে ২০০০ টাকা জরিমানা, মত্ত অবস্থায় উঠলে…নয়া নিয়ম রেলের
তবে জাতীয় স্তরে নিজেদের হাত শক্ত করতে গিয়ে, রাজ্যস্তরে সমস্যা হতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কারণ ফড়ণবীস এবং শিন্ডের মধ্যে মনোমালিন্যের খবর শোনা যাচ্ছে বেশ কিছু দিন ধরেই। দিল্লি সফরে গিযে সেই নিয়ে বিজেপি-র হাই কম্যান্ডের কাছে অনুযোগও করেছিলেন শিন্ডে। ২০২৪ সালে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী না করার বিষয়টি যে সমর্থকরা ভাল ভাবে নেননি, খোলাখুলি জানান তিনি। এর আগে, বিজেপি নেতৃত্বের কাছে গিয়ে তিনি লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে নিজের দলের জন্য বেশি আসনও আদায় করে নিয়েছিলেন। উদ্ধব-সেনার ছয় সাংসদকে পেলে কেন্দ্রে মোদির মন্ত্রিসভায় নিজের লোককে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকে বসানোর সুপারিশও করতে পারেন শিন্ডে। আর তাই অশনি সঙ্কেত দেখছেন অনেকেই।
এতদিন লোকসভায় সাত সাংসদের নিরিখে একটি মাত্র মন্ত্রকেই নিজের লোক বসাতে পেরেছিলেন শিন্ডে। প্রতাপরাও জাধবকে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল। NDA-র অন্য দুই শরিক দল, ১৬ জন সাংসদের তেলুগু দেশম পার্টি এবং ১২ জন সাংসদের সংযুক্ত জনতা দল থেকে একজন করে মন্ত্রী এবং একজন করে প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। ১৩ জন সাংসদ দেখিয়ে শিন্ডেও নিজের লোকের জন্য মন্ত্রিত্ব চাইতে পারেন।পাশাপাশি, ২০২৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনকেও পাখির চোখ করছেন শিন্ডে। দলের সংগঠনকে মজবুত করতে চাইছেন তিনি। যে কারণে শ্রীকান্ত শিন্ডেকে ১৬০টি বিধানসভা কেন্দ্র ঘুরে দেখতে পাঠিয়েছেন।
পরস্পরের শরিক থাকাকালীনও বিজেপি এবং অবিভক্ত শিবসেনার মধ্যে আসন নিয়ে বার বার টানাপোড়েন চোখে পড়েছে। ১৯৮৯ সালে জোট হওয়ার পর বিজেপি ২২টি লোকসভা আসনে প্রার্থী দেয়, শিবসেনা প্রার্থী দেয় ছয় আসনে। কিন্তু ২০১৯ সাল আসতে আসতে সেই সংখ্যায় ফারাক দেখা দেয়। বিজেপি ২৫টি আসনে নির্বাচনে লড়ে, শিবসেনা লড়়ে ২৩টি আসনে। কল্যাণ এবং দক্ষিণ মুম্বইয়ের মতো কেন্দ্রও শিবসেনাকে ছেড়ে দিতে হয় তাদের। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আবার বিজেপি যেখানে ২৮টি আসনে প্রার্থী দাঁড় করায়, শিন্ডে-সেনা প্রার্থী দিতে সফল হয় ১৫টি আসনে। কিন্তু ওই ২৮টি আসনের মধ্যে মাত্র ন’টিতেই জয়ী হয় বিজেপি। তাদের স্ট্রাইক রেট ছিল ৩১ শতাংশ। সেই তুলনায় ১৫টি আসনের মধ্যে সাতটিতে জয়ী হয় শিন্ডে সেনা, ৪৬।৬৬ শতাংশ স্ট্রাইক রেট ছিল তাদের। অজিত পওয়ারের NCP চারটি আসনে লড়লেও মাত্র একটিতে জয়ী হয়। তাই শিন্ডে-শিবসেনার হাত মজবুত হলে, তাতে বিজেপি-র চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।কারণ দিল্লি সূত্রে জানা যাচ্ছে, উদ্ধব-শিবসেনার ছয় বিদ্রোহী সাংসদ শিন্ডে-শিবসেনায় যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রেখেছেন। কথা হয়েছে, আগামী লোকসভা নির্বাচনে তাদের প্রার্থী করতেই হবে। বিজেপি-ও তাতে সম্মত হয়েছে। সেই শর্ত মানা হলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ২৫টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার দাবি তুলতে পারেন শিন্ডে। সেক্ষেত্রে পিছু হটে হতে পারে বিজেপি-কে।
Abhishek Banerjee News | চার্টার্ড ফ্লাইটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি যাওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে গুঞ্জন | ABP ANANDA LIVE