জেনে নিন, কী ছিল নির্বাচনের ফলাফল?
পার্টি কিউবেকোয়া (PQ) সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬৪টি আসনের থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে। ফলে এখন তারা সংখ্যালঘু সরকার গঠন করবে। ১০ বছরেরও বেশি সময় পর ফের কিউবেকের ক্ষমতায় ফিরেছে কিউবেকোয়া পার্টি। নির্বাচনের ফলাফলে প্রাক্তন শাসক দল ‘কোয়ালিশন অ্যাভেনির কিউবেক’ (CAQ)-এর কার্যত ভরাডুবি হয়েছে।
কিউবেকের এই সমস্যা কী?
কিউবেক কানাডার একমাত্র ফরাসিভাষী প্রদেশ, যেখানে কানাডার বাকি অংশ মূলত ইংরেজিভাষী। নিজেদের ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য এখানকার মানুষ স্বাধীনতা চান। ১৭৬৩ সালে ব্রিটেন ফ্রান্সকে পরাজিত করে এই অঞ্চল দখল করেছিল। এরপর থেকেই ফরাসি সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরেজ শাসনের প্রতি অসন্তোষ রয়েছে। কিউবেকের মানুষের ধারণা, তাদের প্রয়োজন ও নীতিগুলি কানাডার বাকি অংশের থেকে আলাদা। তাই তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়ার অধিকার চান। ১৯৮২ সালে কানাডা নতুন সংবিধান গ্রহণ করার সময় কিউবেক তাতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিল। তাদের দাবি ছিল, ওই সংবিধানে কিউবেকের বিশেষ মর্যাদাকে যথেষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
কিউবেককে আলাদা দেশ করার প্রস্তুতি!
দলের প্রধান প্লামোঁদোঁ নির্বাচনী প্রচারের সময়ই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে তিনি কানাডা থেকে স্বাধীনতার বিষয়ে গণভোট করাবেন। জয়ের পর নিজের ভাষণেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কিউবেকের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা হবে। এর আগে কিউবেকে ১৯৮০ এবং ১৯৯৫ সালেও আলাদা দেশ তৈরির বিষয়ে গণভোট হয়েছিল। দুই ক্ষেত্রেই সামান্য ব্যবধানে স্বাধীনতার প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী কার্নির সমস্যা বাড়ল:
এই নির্বাচনের ফল কানাডার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সামনে নতুন মাথাব্যথা তৈরি করেছে। ফরাসিভাষী প্রদেশ হিসেবে কিউবেকের আলাদা পরিচয় রয়েছে। ইতিমধ্যেই কর এবং অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রদেশটির যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। এবার বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের ক্ষমতায় আসার ফলে কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
কানাডায় খালিস্তানপন্থীরা কী করে?
কানাডায় খালিস্তান আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত ও কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে এটি অন্যতম প্রধান উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে। কানাডায় শিখ সম্প্রদায়ের একটি বড় এবং প্রভাবশালী জনসংখ্যা রয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, তবে তাঁদের মধ্যে একটি খুব ছোট অংশ খালিস্তানপন্থী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।
খালিস্তানি গোষ্ঠীগুলি ভারত থেকে আলাদা পঞ্জাব রাজ্য গঠনের দাবিতে কানাডার সংসদ, জনসমাগমের স্থান এবং ভারতীয় দূতাবাসগুলির বাইরে বিক্ষোভ দেখায়। এর মধ্যে ‘শিখস ফর জাস্টিস’ (SFJ) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এই সংগঠন কানাডার সারে এবং টরন্টোর মতো শহরে অনানুষ্ঠানিক খালিস্তান গণভোটের আয়োজন করে, যেখানে তারা প্রবাসী শিখদের ভারতের থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়।
বিভিন্ন কর্মসূচিতে ভারতবিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়, ভারতীয় নেতাদের কুশপুতুল বা ট্যাবলো বের করা হয়। ভারতীয় কূটনীতিকদের নিশানা করে পোস্টার প্রকাশ করা হয়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গুরুদ্বারের পরিচালন কমিটির উপর খালিস্তানপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যেখান থেকে তারা নিজেদের প্রচার চালানো এবং অর্থ সংগ্রহের কাজ করে।
এই বিষয়ে কানাডা সরকারের কী মত?
কানাডা সরকার এই বিষয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় খালিস্তানপন্থী বিক্ষোভের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে না। কানাডায় লিবারেল পার্টি এবং নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি নিজেদের প্রভাবাধীন শিখ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করতে চায় না। যদিও ১৯৮৫ সালের কনিষ্ক বিমান বিস্ফোরণের পর ‘বব্বর খালসা ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল শিখ ইয়ুথ ফেডারেশন’-এর মতো খালিস্তানি গোষ্ঠীগুলিকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তালিকায় রাখা হয়েছিল। তবে SFJ-এর মতো রাজনৈতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করা সংগঠনগুলির উপর সেখানে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে SFJ ‘রেফারেন্ডাম ২০২০’-এর স্লোগান দেয়। ভারত ক্রমাগত কানাডার কাছে আপত্তি জানিয়ে এসেছে যে, সেখানকার মাটি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বিষয়টি চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ২০২৩ সালের জুনে, যখন কানাডার সারে শহরে খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী হরদীপ সিং নিজ্জরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভারত তাকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সংসদে বিবৃতি দিয়ে দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে ভারত সরকারের এজেন্টদের হাত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ভারত এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেয়।
এই ঘটনার পর ভারত ও কানাডার সম্পর্কেও অনেকটাই ফাটল ধরে। দুই দেশ একে অপরের কূটনীতিকদের বরখাস্ত করে, ভিসা পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে ব্যাপক টানাপোড়েন দেখা যায়। ভারত ক্রমাগত দাবি করে এসেছে যে, কানাডা যেন নিজের মাটি থেকে পরিচালিত সংগঠিত অপরাধ এবং ভারতবিরোধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। অন্যদিকে, কানাডা এটিকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে।