সোমবার হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাট কর্মীদের প্রকাশ করা ৫৩ পাতার এই রিপোর্টে ১১ জন মহিলার বক্তব্য ও অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। তাঁদের অভিযোগের সঙ্গে এপস্টিনের উপস্থিতি বা তাঁর সঙ্গে কথিত যোগসূত্রের প্রসঙ্গও জড়িয়ে রয়েছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা একটি অভিযোগ করেছেন বিয়াত্রিস কিউল (Beatrice Keul)। তিনি একজন মডেল এবং প্রাক্তন মিস সুইৎজারল্যান্ড। কংগ্রেসের কর্মীদের কাছে কিউল দাবি করেছেন, ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কের প্লাজ়া হোটেলের একটি স্যুইটে ট্রাম্প তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ২৪ বছর।
রিপোর্টটি পর্যালোচনা করেছে সংবাদমাধ্যম TIME। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিউল জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিযোগিতা ‘আমেরিকান ড্রিম পেজেন্ট’-এর একটি মধ্যাহ্নভোজের অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের পরিচয় হয়। কিউলের দাবি, ট্রাম্প তাঁর সহযোগী পাওলো জ়াম্পোলির মাধ্যমে মার্কিন ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (NYU) ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কিউল আরও জানিয়েছেন, ওই অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে এপস্টিনের কথাও হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এপস্টিন তাঁকে বলেছিলেন, ডন (ট্রাম্প)-এর সঙ্গে তিনি ‘অনেক পার্টির’ আয়োজন করেছেন।
কিউলের অভিযোগ, ওই দিনই পরে ট্রাম্প তাঁকে একটি হোটেল স্যুইটে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে ট্রাম্প তাঁকে ধর্ষণ করেন বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনার ফলে তিনি রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন। কিউলের আরও অভিযোগ, ট্রাম্প তাঁকে বিষয়টি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেন। পাশাপাশি, ভিসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাবও পুনরায় দেন।
কিউল জানিয়েছেন, আমেরিকায় পৌঁছনোর পর তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রতিযোগিতা ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী, সুইৎজারল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর হাওয়াইয়ে ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত আরেকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। মুখপাত্র লরেন বিস বলেছেন, এপস্টিন-সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পকে ‘সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ প্রমাণ করা হয়েছে’। তাঁর দাবি, প্রশাসনের কাজকর্ম থেকে মার্কিন নাগরিকদের মনোযোগ সরাতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও অন্যায় করার অভিযোগ ট্রাম্প বারবার অস্বীকার করেছেন।
প্রতিনিধি জেমি রাসকিনের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাট কর্মীদের তৈরি এই রিপোর্টে মহিলাদের সাক্ষাৎকার, এফবিআইয়ের নথি এবং ‘এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর আওতায় প্রকাশিত বিভিন্ন নথির উল্লেখ রয়েছে। রাসকিন হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য।
বিয়াত্রিস কিউলের অভিযোগ ছাড়াও, রিপোর্টে আরও চার মহিলার এমন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে, যাঁরা এর আগে প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন।
এই মহিলাদের মধ্যে রয়েছেন স্টেসি উইলিয়ামস। তাঁর অভিযোগ, এপস্টিনের উপস্থিতিতে ট্রাম্প টাওয়ারের নিজের অফিসে ট্রাম্প তাঁকে যৌন হেনস্থা করেছিলেন। জিল হার্থের অভিযোগ, মার-আ-লাগোতে ট্রাম্প তাঁকে জোর করে চুম্বন করেন এবং তাঁর শরীর স্পর্শ করেন।
এ ছাড়াও, কেটি জনসন নামে পরিচয় দেওয়া এক মহিলা এফবিআইকে জানিয়েছিলেন, ১৯৯৪ সালে, যখন তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছর, তখন ট্রাম্প ও এপস্টিন তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন বলে তাঁর অভিযোগ।
‘জেন’ ছদ্মনামে চিহ্নিত আরও এক মহিলা এফবিআইকে জানিয়েছিলেন, তাঁর বয়স যখন ১৪ বছর, তখন এপস্টিন তাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এপস্টিন অথবা তাঁর সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল কয়েকজন মহিলাকে ট্রাম্পের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, যৌন পাচারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ম্যাক্সওয়েল।
রিপোর্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলির তদন্ত এবং এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে বিচার বিভাগের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন বিশেষ কৌঁসুলি (স্পেশাল কাউন্সেল) নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন জেমি রাসকিন।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে জেলে ম্যাক্সওয়েলকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তৎকালীন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লঁশে এক সাক্ষীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকতে পারেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন ডেমোক্র্যাটরা। বর্তমানে ব্লঁশে অ্যাটর্নি জেনারেল।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই জিজ্ঞাসাবাদের সময় ব্লঁশে অন্তত তিনবার ম্যাক্সওয়েলকে ‘জেন’ সম্পর্কে আলোচনা করতে বাধা দিয়েছিলেন। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘চলুন, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কথা না বলি।’ ডেমোক্র্যাট কর্মীদের দাবি, এই কথোপকথন থেকে সাক্ষীকে প্রভাবিত করা অথবা তদন্তে বাধা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে এই অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও মামলায় এখনও অভিযোগপত্র দাখিলের খবর নেই।
এপস্টিনের সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত সীমিত রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ গোপন করার অভিযোগও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে তুলেছেন রাসকিন।
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাসকিন বলেছেন, এপস্টিনের নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া মহিলাদের বক্তব্য শোনা উচিত। আইন অনুযায়ী যে নথিগুলি প্রকাশ করার কথা, সেগুলি প্রকাশের পাশাপাশি এপস্টিনের কথিত সহযোগীদের এবং এই মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এই রিপোর্টে পাওলো জ়াম্পোলির ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। তিনি একজন মডেলিং এজেন্ট এবং দীর্ঘদিনের ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সম্প্রতি পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনে একটি কূটনৈতিক পদেও ছিলেন তিনি।
এপস্টিন-সংক্রান্ত নথিতে থাকা এফবিআইয়ের রেকর্ডের উল্লেখ করে ডেমোক্র্যাট কর্মীদের অভিযোগ, এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয়ের আগে তরুণী মডেলদের জন্য মার্কিন ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন জ়াম্পোলি।
রিপোর্টে উল্লেখ করা একটি ঘটনায় ১৮ বছর বয়সি এক মডেলের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ, এপস্টিনের কাছে তাঁকে ম্যাসাজ করার জন্য নিয়ে যাওয়ার আগে ওই মডেলের ভিসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে ওই মহিলা এপস্টিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাট কর্মীদের রিপোর্টে জ়াম্পোলিকে কথিত পাচারচক্রের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলি এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা তুলে ধরতেই ডেমোক্র্যাটরা এই রিপোর্টকে সামনে আনছেন।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কমিটির তদন্তের উপর ডেমোক্র্যাটদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। নির্বাচনে তাঁরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে জেমি রাসকিন জুডিশিয়ারি কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন। সেক্ষেত্রে নথি চাওয়া এবং সমন জারি করে সাক্ষীদের হাজির করানোর ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা বাড়বে।
তবে স্বাধীন বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগের দাবির ক্ষেত্রেও বাধা রয়েছে। কারণ, এই নিয়োগের সিদ্ধান্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের হাতে। অথচ রিপোর্টেই এপস্টিন-সংক্রান্ত বিষয় পরিচালনায় অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এপস্টিনের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে যৌন পাচারের অভিযোগে বিচার শুরু হওয়ার অপেক্ষার মধ্যেই ২০১৯ সালের অগস্টে নিউ ইয়র্কের একটি জেলে তাঁর মৃত্যু হয়। যৌন নির্যাতন ও নাবালিকাদের পাচারের ঘটনায় ভূমিকার জন্য ২০২১ সালে দোষী সাব্যস্ত হন গিসলেন ম্যাক্সওয়েল। তিনি বর্তমানে কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ডেমোক্র্যাট কর্মীদের এই নতুন রিপোর্ট প্রকাশের ফলে এপস্টিন-সংক্রান্ত নথিতে কী তথ্য রয়েছে, কোন তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি এবং তাঁর নির্যাতনচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন এমন ব্যক্তিদের ভূমিকা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও জোরালো হল। তবে রিপোর্টে উল্লিখিত অভিযোগগুলিকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না।