Last Updated:
শেষ পর্যন্ত তাই গল্পটা শুধু ‘গাধার দেশ পাকিস্তান’ নিয়ে রসিকতার নয়। একটি গাধার পিঠে চাপতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং চিনের কয়েকশো বছরের ঐতিহ্যবাহী বাজার—সবকিছুর ভার।
প্রদীপ চক্রবর্ত্তী: ‘ইধর ভি গাধে হ্যায়, উধর ভি গাধে হ্যায়’—পাকিস্তানকে নিয়ে এমন ঠাট্টা নতুন নয়। কিন্তু মজার ছলে বলা এই কথার পিছনেও রয়েছে একেবারে বাস্তব একটি অর্থনীতি। কারণ পাকিস্তানে গাধার সংখ্যা নেহাত কম নয়। সরকারি পরিসংখ্যানে দেশটিতে গাধার সংখ্যা প্রায় ৬২ লক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে গাধা সেখানে শুধু বোঝা টানা প্রাণী নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি অংশ।
গাধা নিয়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক ব্যঙ্গও কম হয়নি। কখনও প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার হয়েছে গাধার গাড়ি, কখনও আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে গাধাকে ঘিরে নানা কৌতুক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে অন্য একটি বিষয়—চিনের বাজার। পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় গাধা জবাই এবং সেগুলির চামড়া বা অন্যান্য অংশকে ঘিরে ব্যবসার খবর সামনে এসেছে। আবার বালোচিস্তান ও গওয়াদর অঞ্চলে চিনা সংস্থাগুলির সঙ্গে গাধা-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ গাধাকে ঘিরে এত আগ্রহ কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে গাধার চামড়ার চাহিদার মধ্যে। চিনে গাধার চামড়া থেকে তৈরি ‘এজিয়াও’ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে গাধার চামড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি মূল্যবান পণ্য হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধুই ‘চিনারা গাধা খায়’—এমন সরল গল্প নয়। বরং গাধার চামড়া, তার বাণিজ্যিক মূল্য এবং এজিয়াও-সহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বড় অর্থনৈতিক সমীকরণ। পাক গর্ধবেরা চলে যাচ্ছে চীনে। চীনের প্রাচীন অথচ জনপ্রিয় কয়েকটি ওষুধ তৈরির জন্য গাধার চামড়া প্রয়োজন। চাহিদা বাড়ার জন্য পাকিস্তানে মহার্ঘ হয়ে উঠেছে গাধারা। বিপাকে পড়েছেন পাকিস্তানের স্থানীয় পশুপালকেরা, যাঁরা মালবহন-সহ নানা কাজে গাধার উপরে নির্ভরশীল।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন। পাকিস্তানে গাধার সংখ্যা বিপুল হলেও তার সবটাই তো রফতানির জন্য নয়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গাধা এখনও বহু মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আফ্রিকার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, গাধার চামড়ার জন্য অতিরিক্ত জবাই স্থানীয় মানুষের জীবিকায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পাকিস্তানে এই নতুন শিল্প কতটা বাড়বে এবং তার প্রভাব প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কী হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
গাধার প্রসঙ্গে বাঘের উদাহরণ টেনে আনা হয় প্রায়ই। চিনে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে যে চাহিদা ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও মনে রাখা দরকার—চিন ১৯৯৩ সালে বাঘের হাড় ও গণ্ডারের শিংয়ের বাণিজ্য এবং ঔষধি ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পরবর্তী সময়ে অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক থাকলেও, সেটিকে সরকারি নীতি হিসেবে বর্তমান চিনা বাজারের বৈধ বাণিজ্য হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। ২০১৮ সালেও চিন সরকার বাঘ ও গণ্ডারের পণ্য নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা জানিয়েছিল।
পাকিস্তানের কাছে গাধা এখন শুধুই গ্রামবাংলার মতো পরিচিত বোঝাবাহী প্রাণী নয়। চিনের বাজারের দরজা খুলে যাওয়ায় তার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে মাংস, চামড়া, এজিয়াও এবং বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব। পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য এই ব্যবসা নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নও রয়েছে—চাহিদা বাড়লে গাধার সংখ্যা কমবে কি না, স্থানীয় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের উপর তার প্রভাব কী হবে এবং প্রাণিসম্পদের ভারসাম্য কতটা বজায় থাকবে?
