তবে এই দাবির সত্যতা যাচাই হয়নি। পাকিস্তান এখনও বালোচিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাবি, তারা ওই অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা দখল করেছে।
কোনও অঞ্চল স্বাধীনতার দাবি জানালেই তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র হয়ে যায় না। একটি নতুন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
বালোচিস্তান যদি স্বাধীনতার পথে এগোতে চায়, তবে একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র হতে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে?
রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চারটি মৌলিক শর্ত
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশন। এই নীতি অনুযায়ী, কোনও অঞ্চলকে রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করতে সাধারণত চারটি শর্ত পূরণ করতে হয়।
১. স্থায়ী জনসংখ্যা
একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব স্থায়ী জনসংখ্যা থাকতে হবে। বালোচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও জাতিগত পরিচয়ের জনগোষ্ঠী রয়েছে। তবে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড
রাষ্ট্রের স্পষ্টভাবে নির্ধারিত এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড থাকতে হবে। বালোচিস্তানের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে বালোচ অঞ্চল পাকিস্তান, ইরান এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন অংশজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত।
স্বাধীনতার দাবি সফল করতে হলে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধান জরুরি।
৩. কার্যকর সরকার
একটি দেশের এমন সরকার থাকতে হবে, যা আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, প্রশাসন পরিচালনা করতে, জনসেবা দিতে এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চল শাসন করতে সক্ষম। শুধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই রাষ্ট্র গঠিত হয় না। কার্যকর প্রশাসন ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাও প্রমাণ করতে হয়।
৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার সক্ষমতা
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে স্বাধীনভাবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক চুক্তি করা এবং বৈশ্বিক পরিসরে অংশগ্রহণের সক্ষমতা দেখাতে হয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই সবচেয়ে বড় বাধা। উপরের চারটি শর্ত পূরণ করলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন ধাপ।
আন্তর্জাতিক আইনে এ বিষয়ে মূলত দুটি মতবাদ রয়েছে।
এই মত অনুযায়ী, কোনও অঞ্চল রাষ্ট্র হওয়ার মৌলিক শর্ত পূরণ করলেই তাকে রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা যায়। অন্য দেশের স্বীকৃতি শুধু সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে।
এই মতবাদ বলছে, অন্য স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়া কোনও নতুন রাষ্ট্র পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনি মর্যাদা পায় না। বাস্তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বীকৃতি না থাকলে নতুন ঘোষিত রাষ্ট্রের পক্ষে—
আন্তর্জাতিক সংস্থায় সদস্যপদ লাভ,
বিদেশে দূতাবাস স্থাপন,
আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পাসপোর্ট ইস্যু,
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ,
আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর—
এসবই কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হল রাষ্ট্রসংঘ (UN)-এর সদস্যপদ। তবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই রাষ্ট্রসংঘে সদস্য হওয়া যায় না।
প্রথমে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ প্রয়োজন।
এর জন্য দরকার—
১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে অন্তত ৯টি সমর্থনসূচক ভোট।
স্থায়ী পাঁচ সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের কেউ ভেটো দিতে পারবে না।
স্থায়ী সদস্যদের একজনও ভেটো দিলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে।
নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের পর বিষয়টি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে যায়। সেখানে ১৯৩টি সদস্য দেশের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
বালোচিস্তানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত আইনি নয়, বরং রাজনৈতিক। পাকিস্তান বালোচিস্তানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। ফলে স্বাধীনতার যে কোনও প্রচেষ্টা নিরাপত্তা, সংবিধান ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
এছাড়া প্রতিবেশী ইরান ও আফগানিস্তানের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, কারণ ঐতিহাসিক বালোচ অঞ্চল এই তিন দেশেই বিস্তৃত। অন্য দিকে, চীনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। কারণ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) এবং গওয়াদর বন্দর-সহ একাধিক কৌশলগত প্রকল্পে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে।
বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলিও বিষয়টি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক রুট এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করবে।
ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতা আন্দোলন সফল হতে হলে শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। কার্যকর প্রশাসন, ভূখণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন—এই তিনটির সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১১ সালে সুদানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান এবং দ্রুত রাষ্ট্রসংঘ-সহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। অন্য দিকে, তাইওয়ানের নিজস্ব সরকার, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি থাকলেও ভূ-রাজনৈতিক কারণে এখনও পূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।
সেই কারণে, বালোচিস্তান যদি সত্যিই স্বাধীনতার ঘোষণা করে থাকে, তবুও সেটি হবে দীর্ঘ এবং জটিল এক আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। একটি স্বীকৃত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে কার্যকর শাসনব্যবস্থা, ভূখণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলির স্বীকৃতি—সবকিছুরই প্রয়োজন হবে।