স্পেনের বিরুদ্ধে ০-০ গোলে ড্র-সহ দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে দলটি নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। শনিবার এই কাবো ভার্দেকে হারিয়েই বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। তবে যে ভাবে তাদের জয় ‘অর্জন’ করে নিতে হল, তা কোনও ভাবেই খুশি করবে না সমর্থক থেকে ফুটবলারদের। সাড়ে পাঁচ লক্ষের দেশ কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে লড়াই করতে হল ১২০ মিনিট পর্যন্ত! দু’বার এগিয়ে গিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি গত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে রোমেরোর গোল তাদের জয় নিশ্চিত করে।
কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহাও টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলির একজন হয়ে উঠেছেন। স্পেন ম্যাচের আগেই ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসরণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। জুন মাসের শেষে সেই সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৭৪ লক্ষেরও বেশি হয়েছে।
Cape Verde’s Sidny Lopes Cabral (13) and Jamiro Monteiro (10) react to a loss during the World Cup round of 32 soccer match between Argentina and Cape Verde in Miami Gardens, Fla., Friday, July 3, 2026. (AP Photo/George Walker IV)
মাত্র পাঁচ লক্ষের কিছু বেশি জনসংখ্যার (দশটি দ্বীপে ছড়িয়ে থাকা, যার মধ্যে ৯টিতে জনবসতি রয়েছে) কেপ ভার্দে বরাবরই প্রতিকূলতাকে হার মানাতে অভ্যস্ত। ১৪৬০-এর দশকে পর্তুগিজদের আগমনের পর এই দ্বীপপুঞ্জ আটলান্টিক বিশ্বের গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সান্তিয়াগো দ্বীপে তারা সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে ইউরোপীয়দের প্রতিষ্ঠিত প্রাচীনতম বসতি ‘রিবেইরা গ্রান্দে’ গড়ে তোলে।
বর্তমানে সিদাদে ভেলহা (Cidade Velha) নামে পরিচিত এই শহরটি সমুদ্রপথে বাণিজ্য, অভিবাসন এবং দুঃখজনকভাবে আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাদেশকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব এবং ঘন ঘন খরার কারণে বিপর্যস্ত কেপ ভার্দেতে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ক্রীতদাস প্রথার অবসানের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের সূচনা হয়। এই পরিস্থিতি চলতে থাকে ১৯৭৫ সালে গিনি-বিসাউ-এর সঙ্গে যৌথভাবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দ্বীপপুঞ্জটি স্বাধীনতা অর্জন করা পর্যন্ত।

Cape Verde’s Gilson Benchimol (9) takes a shot against Argentina goalkeeper Emiliano Martinez (23) during the World Cup round of 32 soccer match between Argentina and Cape Verde in Miami Gardens, Fla., Friday, July 3, 2026. (AP Photo/George Walker IV)
এই স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন আমিলকার কাবরাল (Amilcar Cabral)। গিনি-বিসাউয়ে কেপ ভার্দিয়ান বাবা-মায়ের ঘরে তাঁর জন্ম হলেও তিনি কেপ ভার্দেতেই শিক্ষালাভ করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আফ্রিকার সংগ্রামে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং তাঁর অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ব্যাপক সমর্থন লাভ করেন।
স্বাধীনতা অর্জনের পর তৎকালীন মার্কিন বিদেশমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কেপ ভার্দেকে একটি ‘‘টিকে থাকার অযোগ্য রাষ্ট্র’’ বলে আখ্যা দেন। পরবর্তীকালে কয়েকটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও একই মত প্রকাশ করে। তাদের ধারণা ছিল, আয়তনে ছোট এবং প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র হওয়ায় দেশটি স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পর কেপ ভার্দে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে নিজেকে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে।
গণতন্ত্রে উত্তরণ:
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ফলে ১৯৯০-এর দশকে কেপ ভার্দে গণতান্ত্রিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিতে সক্ষম হয়। একদলীয় শাসনের ১৫ বছর পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ‘আফ্রিকান পার্টি ফর দ্য ইন্ডিপেনডেন্স অফ গিনি অ্যান্ড কেপ ভার্দে’ শান্তিপূর্ণভাবে নবগঠিত বিরোধী দল ‘মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’-র কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
এর মাধ্যমে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে। বাস্তবমুখী রাজনীতি এবং সুশাসনের জন্য কেপ ভার্দে নিয়মিত প্রশংসিত হয়ে আসছে। ইব্রাহিম ইনডেক্স অফ আফ্রিকান গভর্ন্যান্স-এ ৫৪টি আফ্রিকান দেশের মধ্যে সেশেলস ও মরিশাস-এর পরেই কেপ ভার্দের অবস্থান তৃতীয়। আফ্রিকায় দেশটির গড় আয়ু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, যা ৭৫ থেকে ৭৭ বছরের মধ্যে। পাশাপাশি দেশটিতে সাক্ষরতার হার ও মানব উন্নয়নের সূচকও বেশ উঁচু। শিশু মৃত্যুর হারও আফ্রিকার সর্বনিম্নগুলির মধ্যে অন্যতম।

Cape Verde’s Gilson Benchimol (9) reacts to a loss during the World Cup round of 32 soccer match between Argentina and Cape Verde in Miami Gardens, Fla., Friday, July 3, 2026. (AP Photo/George Walker IV)
যে দেশে ফুটবল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ফিফা-র সহায়তায় যুব ফুটবল ও প্রতিভা বিকাশে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের ক্রীড়া পরিকাঠামোরও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম উচ্চ অভিবাসন হারসম্পন্ন দেশ কেপ ভার্দের সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ানরা। তাঁদের প্রায়ই কেপ ভার্দের ‘একাদশতম দ্বীপ’ বলা হয়। ধারণা করা হয়, বিদেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ানদের সংখ্যা দেশের স্থায়ী বাসিন্দাদের সংখ্যার চেয়েও বেশি।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স কেপ ভার্দের অর্থনীতিতে বিদেশি সাহায্য বা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাঙ্ক এবং কেপ ভার্দের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, মহামারিজনিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় প্রবাসীরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় ২০২১ সালে রেমিট্যান্স ৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড গড়ে।

জাতীয় ফুটবল দল গঠনের ক্ষেত্রেও কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন এই প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করেছে। ২০০২ সাল থেকে বিদেশে বেড়ে ওঠা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হয়। তাঁদের মধ্যে পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং এমনকি, আয়ারল্যান্ডভিত্তিক খেলোয়াড়রাও রয়েছেন।
২০১৯ সালে আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেস (পিকো নামে পরিচিত) স্মৃতিচারণ করে জানান, তৎকালীন কেপ ভার্দের কোচ রুই আগুয়াস তাঁর সঙ্গে লিঙ্কডইন-এ যোগাযোগ করেছিলেন। তবে বার্তাটি পর্তুগিজ ভাষায় হওয়ায় এবং সেটিকে স্প্যাম মনে হওয়ায় তিনি প্রথমে তা উপেক্ষা করেছিলেন।
তবে কেপ ভার্দের গল্প নিখুঁত সাফল্যের নয়। দেশটির অধিকাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নীচে। অথচ বহু তরুণ-তরুণী বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে উন্নত ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
২০১৯ সালে প্যারিটি আইন পাস হওয়ার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং লিঙ্গসমতা এখনও দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই আইনে নির্বাচনী তালিকায় নারী বা পুরুষ—কোনও পক্ষই ৪০ শতাংশের কম বা ৬০ শতাংশের বেশি প্রতিনিধিত্ব রাখতে পারবে না বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।
৫ জুলাই কেপ ভার্দের স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ানদের উদ্যাপনের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার আগে ৪ জুলাই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচে কেপ ভার্দে আরেকটি হয়তো অঘটন ঘটাতে পারল না, তবে গত ৫০ বছর ধরে তারা প্রমাণ করে আসছে—একটি দেশের আকার কখনও তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।