মিশিগানে ট্রাম্পের বিতর্কিত অনুপ্রবেশবিরোধী অভিযানের কড়া প্রভাব পড়েছিল ভোটারদের উপর। সেই ক্ষোভের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক অনটনের বিষয়গুলিকে প্রচারের মূল হাতিয়ার করেছিলেন মিশরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান আব্দুল এল-সায়েদ।
প্রগতিশীল মতাদর্শের প্রাক্তন ওয়েন কাউন্টির (Wayne County) স্বাস্থ্য অধিকর্তা এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রাক্তন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স। ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম নজরকাড়া লড়াই ছিল এটি। দু’বারের ডেমোক্র্যাট সেনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই আসনটি খালি হয়েছিল।
মিশিগান সেনেট নির্বাচন ২০২৬: কে এগিয়ে ছিলেন?
সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ভোট গণনার মাত্র একাংশ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও এল-সায়েদ রজার্সের থেকে এগিয়ে ছিলেন।
মার্কিন স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৯টা ৪৮ মিনিটে এপি-র তথ্য অনুযায়ী, এল-সায়েদ পেয়েছিলেন ৪,৯০,৬৭৯টি ভোট, যা মোট ভোটের ৫৪.৪ শতাংশ। অন্যদিকে, রজার্স পেয়েছিলেন ৩,৯৬,৪২৮টি ভোট, যা মোট ভোটের ৪৩.৯ শতাংশ। সেই সময় পর্যন্ত আনুমানিক ১৮ শতাংশ ভোট গণনা করা হয়েছিল।
ডেমোক্র্যাটদের কাছে এই নির্বাচনী লড়াই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে লড়াইয়ে নেমেছিল দলটি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের আশা বজায় রাখতে মিশিগানের মতো রাজ্যগুলিতে আসন হারানো ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মিশিগানের সেনেট নির্বাচন?
সেনেট নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে মিশিগান ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এপি-র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের পর থেকে এই রাজ্যে মার্কিন সেনেট নির্বাচনে কোনও রিপাবলিকান প্রার্থী জয়ী হননি।
তবে গ্যারি পিটার্সের অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত রিপাবলিকানদের সামনে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন এই আসনটি দখলের এক বিরল সুযোগ তৈরি করে দেয়। ২০২৪ সালের সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের কাছে ২০ হাজারেরও কম ভোটে পরাজিত হওয়ার পর, এবার সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন রজার্স।
এবারের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম ব্যালটের শীর্ষে না থাকলেও প্রচার চালাতে হয়েছে রজার্সকে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং ইরানের সঙ্গে চলতে থাকা যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগের আবহে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের বৃহত্তর সেনেট কৌশলের ক্ষেত্রে মিশিগানের আসন ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুল এল-সায়েদ বনাম মাইক রজার্স: কোন বিষয়গুলি নির্বাচনী লড়াইকে প্রভাবিত করেছিল?
স্বাস্থ্য পরিষেবা, অর্থনীতি, ইজরায়েলের প্রতি আমেরিকার সমর্থন এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ঘিরে আবর্তিত হয়েছিল নির্বাচনী প্রচার।
নিজেকে এমন একজন প্রগতিশীল প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এল-সায়েদ, যিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রচলিত ভোটব্যাঙ্কের বাইরেও সমর্থন আদায় করতে সক্ষম। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয় ছিল সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জনমুখী অর্থনৈতিক বার্তা। পাশাপাশি, তরুণ ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করার উপরও বিশেষ জোর দিয়েছিলেন তিনি।
গত অগাস্টে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের সমর্থনপুষ্ট কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন ওয়েন কাউন্টির প্রাক্তন স্বাস্থ্য অধিকর্তা এল-সায়েদ। এই লড়াই ছিল অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ।
তবে প্রাইমারি নির্বাচনের পর দলের অভ্যন্তরে যথেষ্ট বিভাজন তৈরি হয়। কৃষ্ণাঙ্গ এবং ইহুদি ভোটারদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাওয়া স্টিভেন্স নির্বাচনী প্রচারের শেষ কয়েক দিনে রজার্সকে সমর্থন জানিয়ে ডেমোক্র্যাটদের চমকে দেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত একটি রাজ্যে স্টিভেন্সের এই সমর্থন রিপাবলিকানদের অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়।
ইজরায়েল বিতর্ক এবং এল-সায়েদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণ:
ইজরায়েলকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত আলোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও নির্বাচনী প্রচারে ছায়া ফেলেছিল। ইজরায়েলের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত এল-সায়েদ মিশিগানের একটি সিনাগগে মার্চ মাসে হওয়া হামলার ঘটনায় তাঁর প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন। পরবর্তী সময়ে তাঁর মন্তব্যে যাঁরা আঘাত পেয়েছিলেন, তাঁদের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেন তিনি।
কোনও ধরনের যোগসূত্রের প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও রিপাবলিকানরা বারবার তাঁকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। এপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পও বারবার এল-সায়েদকে ‘জিহাদি’ বলে উল্লেখ করেন।
নির্বাচনী প্রচারে এই বিতর্ক একটি বড় বিভাজনের কারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মিশিগানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বসবাসকারী ইহুদি, মুসলিম এবং কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের উপস্থিতির কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।