নয়াদিল্লি: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্য থেকে তৈরি হয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। এবার সুপ্রিম কোর্টের আর এক বিচারপতির মুখে উঠে এল ‘পিঁপড়ে’র কথা। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার উপর জোর গিয়ে তাঁর মুখে ‘পিঁপড়ে’ শব্দটি শোনা যায়। (Justice Ujjal Bhuyan)
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এই মন্তব্য করেছেন। ‘বিধি সেন্টার ফর লিগাল পলিসি’র বিচারবিভাগীয় স্বচ্ছতা সূচকের উদ্বোধনে গিয়ে এমন মন্তব্য করলেন তিনি। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার উপর জোর দিয়ে বলেন, “কাউকে সুপারিশ করার আগে কলেজিয়ামের উচিত কারণ ব্যাখ্যা করা।” বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি কেন মানুষের বিচার-বিবেচনার বাইরে রাখা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। (Supreme Court)
ওই আলোচনাসভায় যোগ দিয়ে বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, “কারণ গোপন করে আমরা বিচারব্যবস্থায় এমন লোকজনকে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছি যাঁরা পরবর্তীতে কোনও জনগোষ্ঠীকে হয় পিঁপড়ের সঙ্গে তুলনা করেন অথবা এমন সব মন্তব্য করেন, যা অসাংবিধানিক এবং সংবিধানের মূল্যবোধের পরিপন্থী।” বিচারপতি ভুঁইয়ার মতে, বিচারবিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে কারণ দেখানো না হলে, সেই সব বিচারপতিদের প্রতি অবিচার করা হয়, যাঁদের কাজ এবং কৃতিত্ব মানুষের সামনে আসা উচিত।”
আরও পড়ুন: ক্রকস ছাড়া চলে না? পায়ের ক্ষতি করছেন, নিজেরও, শিশুরও, সতর্ক করলেন চিকিৎসকরা
বিচারপতি ভুঁইয়া যুক্তি দেন যে, বিচারবিভাগে নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলে, তা নিয়ে আলোচনার পরিসর থাকলে, এমন ব্যক্তিদের পদোন্নতি আটকানো যেতে পারে, যাঁদের মতামত সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তাঁর বক্তব্য, “ওই ধরনের ব্যক্তিদের পদোন্নতি আটকাতে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। কী ঘটেছে, উচিত তার ব্যাখ্যা দেওয়া। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের পরিসর থাকলে ক্ষতি কী?”
শুধু নিয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, বিচারপতি বদলির প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হওয়া উচিত বলে মত বিচারপতি ভুঁইয়ার। তিনি জানান, বর্তমানে বিচারপতিদের পদোন্নতি এবং বদলি সংক্রান্ত আলোচনায় গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। কোনও সুপারিশ প্রত্যাখ্য়ান বা আটকানোর ক্ষেত্রেও আলোচনার সুযোগ নেই। কলেজিয়ামের তরফে যে সময় মানদণ্ড স্থির করা হয়, তা জনসমক্ষে আসে না। সেই সংক্রান্ত নথিও প্রকাশ করা হয় না সকলের জন্য।
আরও পড়ুন: লক্ষ লক্ষ বই ধ্বংস করছে AI সংস্থাগুলি, প্রযুক্তির পিছনে দৌড়তে গিয়ে ক্ষতি হচ্ছে বিরাট
কলেজিয়ামের শেষ তিন বিবৃতির উল্লেখ করে বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়ামের শেষ তিনটি বিবৃতি দেখেছি আমি, যাতে পদোন্নতির সপক্ষে কোনও কার্যকারণের উল্লেখই নেই। আগের বিবৃতির চেয়ে একেবারে আলাদা, যাতে সুপারিশের সপক্ষে কারণের উল্লেখ থাকত।” বিচারবিভাগের অভ্য়ন্তরীণ বৈসাদৃশ্যের দিকে আঙুল তোলেন তিনি। বিশেষ করে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলে বলেন, “আইনব্যবস্থা শুধুমাত্র ক্ষমতা প্রয়োগের জায়গা নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নইলে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় যে, রক্ষকদের উপর কে নজর রাখবে?”
সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম ব্যবস্থা নিয়ে কম বিতর্ক নেই। প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ বিচারপতিদের নিয়ে তৈরি কলেজিয়ামই বিচারপতি নিয়োগ, বিচারপতিদের পদোন্নতি এবং বদলি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকারের তরফে সিদ্ধান্তবদল বা বিবেচনার আর্জি জানানো যেতে পারে। তবে পরিসর ততটাও বর্ধিত নয়। কলেজিয়ামের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে বেশ কিছু দিন ধরেই। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের বিচার-বিবেচনার সুযোগ না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বার বার। যদিও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে রেখে নিজেদের নীতি-নিয়মের পক্ষেই সওয়াল করেছে কলেজিয়াম। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ও কলেজিয়ামের সমর্থনে কথা বলেন। সেই নিয়ে বিচারব্যবস্থার অন্দরেও সংঘাত তৈরি হতে দেখা গিয়েছে।