বাংলাদেশের ব্যাঙ্কগুলি থেকে মোট যে ঋণ দেওয়া হয়, তার তেত্রিশ শতাংশই খেলাপি। মানে ওই টাকাটা জলে দেওয়া। আসল ফেরত পাওয়া তো দূরের স্বপ্ন। সুদটুকু পাওয়ারও কোনও সম্ভাবনা নেই। এবং এই পরিসংখ্যান বিশ্বে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পিছনে ফেলে দিয়েছে, চাদ, গিনি, ঘানা ও আলজেরিয়াকে। মানে সভ্যতার একেবারে পিছনের সারিতে পড়ে থাকা দেশগুলিরও পিছনে চলে গিয়েছে বাংলাদেশ। ঋণ খেলাপির তালিকায় আগে শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্থ ইউক্রেন। কিন্তু, আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে এসে পরিস্থিতি বদলে ফেলেছে ইউক্রেন। আর বাংলাদেশ ঠিক উল্টোপথে হেঁটে ঋণখেলাপে রেকর্ড করে নিয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাঙ্কের হিসেব বলছে সেদেশে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৬ লক্ষ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ৮০% থেলাপি ঋণ হচ্ছে বাংলাদেশের যে ৫ ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণ হয়েছে তাদের।
কোন পাঁচটি ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণ হয়েছে? এক্সিম ব্যাঙ্ক, ফার্স্ট সিকিওরিটি ইসলামি ব্যাঙ্ক, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাঙ্ক, ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক, গ্লোবাল ইসলামি ব্যাঙ্ক। এই পাঁচটি ব্যাঙ্কের মিলিত ঋণখেলাপি মোট, ঋণখেলাপির আশি শতাংশ। তার মানে এই ব্যাঙ্কটি থেকে যারা ঋণ নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে আসল বা সুদ কোনওটাই আদায় করা যায়নি। হাসিনা বিদায়ের পর ঋণখেলাপির পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুন মানে ঋণখেলাপি ছিল ২ লক্ষ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা৷ ২০২৬ এর মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৬ লক্ষ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা৷ তার মানে হাসিনা বিদায়ের পর খেলাপি ঋণ ২ বছরে ৩ লক্ষ ৯৫ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা৷
তাহলে কি ধরে নেওয়া যায়, হাসিনা বিদায়ের পর বাংলাদেশ চোরেদের মুক্তাঞ্চল হয়ে গিয়েছে? যে, যেভাবে পারে দেশকে লুটেছে? এর জন্যে তারেক রহমানকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তিনি তো এই সবে এলেন। মাঝের দুবছর তো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি কী করেছেন? হাসিনা অনুগামীদের অভিযোগ, ইউনূস নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছেন।
ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থ পাচারের মামলা খারিজ হয়েছে৷ মকুব হয়ে গিয়েছে ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ২০২৯ পর্যন্ত কর৷ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকাও মকুব৷ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের সরকারি মালিকানা কমিয়ে শেয়ার চলে গিয়েছে অদৃশ্য হাতে৷ গ্রামীণ টেলিকম পেয়েছে ডিজিটাল ওয়ালেট খোলার অনুমতি৷ গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে৷ বিনা টেন্ডারে সমাজকল্যাণ মন্ত্রকের টাকা গেছে গ্রামীণ ট্রাস্টে৷ বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো বা BBS-এর হিসেব বলছে, ইউনূসের আমলে আরও তিরিশ লক্ষ বাংলাদেশী দারিদ্রসীমার নীচে নেমে গিয়েছেন।
গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর-ছাড়ের সুবিধা পেয়েছিল—এটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য। তবে এই সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাকালীন আইনি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলসহ শর্তসাপেক্ষ ছিল। অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে ৬৬৬ কোটি টাকার কর সংক্রান্ত মামলায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট এনবিআরের পক্ষে রায় দিয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। তাই ‘ইউনূস নিজের প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন’—এমন রাজনৈতিক অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে তুলে ধরার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আদালতের রায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আলাদা করে যাচাই করা অবশ্য জরুরি।
বাংলাদেশের ব্যাঙ্কিং খাতে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু কোনও একটি সরকার বা একটি সময়ের সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নজরদারি, ঋণ পুনঃতফসিল এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সে দেশে।